মায়ের গর্ভে আসার পর থেকেই ক্রমান্বয়ে একটি শিশুর বিকাশ শুরু হয়, যা একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে জন্ম গ্রহণের পর শিশুর এই পরিবর্তনগুলো সবার চোখে পড়ে। সাধারণত মা-বাবা শিশু কবে হামাগুড়ি দিল, কখন হাঁটলো বা কথা বলতে শুরু করলো মূলত এসব শারীরিক বিকাশের ওপরই বেশি নজর দেন। কিন্তু এর পাশাপাশি শিশুর মানসিক বিকাশের প্রতিও সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
মায়ের গর্ভ থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত প্রারম্ভিক বিকাশ শেষ করে শৈশব এবং কৈশোরের বয়ঃসন্ধিকাল পেরিয়ে শিশু একদিন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। এই প্রতিটি পর্যায়ে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও ঘটে। এভাবে ক্রমান্বয়ে দক্ষ হয়ে ওঠাকেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ বলা হয়।
বিকাশের বিভিন্ন স্তর ও বয়সভিত্তিক লক্ষণ শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার দক্ষতা অর্জনের নির্দিষ্ট কিছু স্তর রয়েছে। বয়স অনুযায়ী শিশু নির্ধারিত কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারছে কি না, তা খেয়াল রাখা জরুরি:
প্রথম মাস: শিশুর মাথা একদিকে ফিরিয়ে চিত হয়ে শোয়া, হঠাৎ আওয়াজে চমকে যাওয়া বা শরীর স্থির হয়ে যাওয়া, হাতের মুঠো বন্ধ করে রাখা এবং হাতের তালুতে কিছু ছোঁয়ালে তা ধরার চেষ্টা করা।
২-৩ মাস: নিজের মাথা স্থির করতে শেখা, চোখের দৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের ওপর স্থির করা, চিত হয়ে শুয়ে দুই হাত-পা সমানভাবে নাড়া এবং কান্নার পাশাপাশি মুখ দিয়ে নানারকম আওয়াজ করা। এ সময় শিশু তার মাকে চিনতে পারে ও গলার আওয়াজে সাড়া দেয়।
৬ মাস: আশপাশের শব্দ শুনলে মাথা ঘোরানো, চিত থেকে উপুড় বা উপুড় থেকে চিত হওয়া, ঠেস দিয়ে অল্প সময়ের জন্য বসা এবং উপুড় হয়ে শুয়ে হাত-পা ছড়িয়ে শরীরের ভার নেওয়া।
৯ মাস: কোনো অবলম্বন বা ঠেক ছাড়া একা বসতে পারা এবং হাঁটু ও হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দেওয়া।
১২ মাস: ঠেঁলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা, আসবাবপত্র ধরে হাঁটা এবং ‘মা, মা’ বলতে শুরু করা।
১৮ মাস: কোনো সাহায্য ছাড়াই গ্লাস ধরে পানি পান করা, একা একা হাঁটা, নিজে নিজে খেতে পারা এবং দু’একটি শব্দ বলা।
২ বছর: পায়জামার মতো কিছু জামাকাপড় খুলে ফেলতে পারা, না পড়ে দৌড়াতে পারা, ছবির বই দেখে আনন্দিত হওয়া এবং অন্যদের কথা নকল করা ও নিজের শরীরের কিছু অংশ চেনাতে পারা।
৩ বছর: হাত তুলে কাঁধের ওপর থেকে বল ছুঁড়তে পারা, সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া (যেমন ছেলে না মেয়ে?) এবং অন্তত একটি রঙের নাম বলতে পারা।
৪ বছর: সাইকেল প্যাডেল করতে পারা এবং বই, পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের ছবির নাম বলতে পারা।
৫ বছর: জামাকাপড়ের বোতাম লাগাতে পারা, অন্তত তিনটি রঙের নাম বলতে পারা এবং পা বদল করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারা।
বিকাশে বিলম্ব বুঝবেন যেভাবে সব শিশুর বিকাশ একই গতিতে হয় না, কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে বিকাশের এই স্তরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ যদি শিশুর মধ্যে প্রকাশ না পায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণভাবে নির্ধারিত দক্ষতার ২৫ শতাংশ প্রকাশ না পেলে শিশুর বিকাশে বিলম্ব হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘একটি শিশু মাতৃগর্ভে আসার পর থেকেই তার বিকাশ শুরু হয়। তবে শিশুটি জন্মের পরই সেটা মানুষের চোখে পড়ে। জন্মের পর থেকেই শিশুর বিকাশের প্রতি মা-বাবাকে নজর দিতে হবে। শিশু বিকাশে যেন কোনোভাবেই ত্রুটি না থাকে সবার আগে সে দিকে নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে একটি সুস্থ স্বাভাবিক শিশুই জাতির ভবিষ্যৎ।’
মন্তব্য করুন