মুমিনের জীবন আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ হওয়াই তার প্রকৃত সৌভাগ্য। কিন্তু ব্যস্ততার এই যুগে দীর্ঘ সময় ইবাদতে ব্যয় করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। মহান আল্লাহ তাআলা তার অসীম দয়ায় বান্দার জন্য কিছু সংক্ষিপ্ত অথচ অপরিসীম সওয়াবের আমল সহজ করে দিয়েছেন। এমনই একটি মহিমান্বিত ও ফজিলতপূর্ণ জিকির শিক্ষা দিয়েছেন প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ (সা.), যা স্বল্প সময়ে পাঠ করলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাসবিহ পাঠের চেয়েও অধিক ভারী সওয়াব বয়ে আনে।
যে জিকিরের সওয়াব সকালভর তাসবিহের চেয়েও ভারী
উম্মুল মুমিনিন হজরত জুওয়াইরিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন ফজরের নামাজের পর তাকে ইবাদত ও জিকিরে মগ্ন অবস্থায় রেখেই ঘর থেকে বের হয়ে যান। এরপর প্রায় দুপুরের দিকে তিনি যখন ফিরে আসেন, তখনো তিনি একই স্থানে বসে আল্লাহর জিকির করছিলেন। তা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন— ‘আমি তোমার কাছ থেকে যাওয়ার পর থেকে চারটি বাক্য মাত্র তিনবার পাঠ করেছি। এই বাক্যগুলো যদি তোমার সকাল থেকে এ পর্যন্ত করা সমস্ত তাসবিহের সঙ্গে ওজন করা হয়, তবে এই জিকিরগুলোর ওজনই অনেক বেশি ভারী হবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) যে মহান জিকিরটি শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হলো—
উচ্চারণ: ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, আদাদা খালকিহি, ওয়া রিদা নাফসিহি, ওয়া যিনাতা আরশিহি, ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা ঘোষণা করছি— তার সমস্ত সৃষ্টির সংখ্যার সমপরিমাণ, তার সন্তুষ্টি অনুযায়ী, তার আরশের ওজন পরিমাণ এবং তার বাণীর কালির পরিমাণ।’
কুরআনের আলোকে জিকিরের মর্যাদা
আল্লাহ তাআला মুমিনদের বেশি বেশি তার স্মরণে মশগুল থাকার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ঘোষণা কর।’ (সুরা আল-আহযাব, আয়াত: ৪১–৪২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে স্মরণ করার চমৎকার প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে বলেন—
‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫২)
হাদিসের শিক্ষা ও করণীয়
এই ঘটনা ও হাদিস থেকে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জন্য বেশ কিছু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে—
আল্লাহর কাছে আমলের মূল্য কেবল সংখ্যার আধিক্যে নয়; বরং ইবাদতের আন্তরিকতা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সুন্নাত তরিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষিপ্ত কিন্তু সহিহ ও সুন্নাহসম্মত জিকিরের প্রতিদান আল্লাহর দরবারে বহুগুণ বেশি হতে পারে।
সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও আজকারগুলো মুমিনের দৈনন্দিন রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
উম্মতের জন্য সহজ ও অধিক সওয়াবের আমল পৌঁছে দিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন প্রিয় নবী (সা.)।
ব্যস্ততাপূর্ণ এই জীবনে আমরা হয়তো সবসময় দীর্ঘ সময় ধরে নফল ইবাদত বা জিকির করার সুযোগ পাই না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের যে অমূল্য জিকিরগুলো শিখিয়ে গেছেন, তা খুব অল্প সময়েই পাঠ করা সম্ভব। তাই প্রতিদিন ফজরের পর কিংবা সকালের ফুরসতে অন্তত তিনবার এই মহান জিকিরটি পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত লাভজনক। আল্লাহর জিকিরে আমাদের অন্তর প্রশান্ত হোক, আমল ভারী হোক এবং এই আমলই যেন কিয়ামতের দিন আমাদের নাজাতের উসিলা হয়ে ওঠে।
মন্তব্য করুন