সরকার নিজেই স্বাস্থ্য খাতের ১০টি 'রোগ' চিহ্নিত করেছে মেধা, জ্ঞান ও যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক চিকিৎসা উপেক্ষা করে বিশেষজ্ঞের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, স্বচ্ছতার অভাব ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবলহীনতা, চিকিৎসা সামগ্রী ও চিন্তায় বিদেশ নির্ভরতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনায় দুর্বলতা, চিকিৎসা শিক্ষায় মানহীনতা, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় অকার্যকারিতা এবং বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারজনিত সমস্যা। এই তালিকাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রাষ্ট্রের নিজের স্বীকারোক্তি। মাঠের চিত্র আরও করুণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার নেই, থাকলেও নার্স ও টেকনোলজিস্টের যে অনুপাত থাকার কথা একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট তা কোথাও নেই। সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং জনবল সংকট দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা, গ্রামাঞ্চলে আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্পন্ন চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। ফলাফল, চিকিৎসা সেবা ঢাকামুখী। একটি জটিল রোগ হলেই রোগীকে ঢাকায় ছুটতে হয়, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা।
এবং এই ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে আস্থার সংকটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিকিৎসায় পরনির্ভরতা প্রকট, স্বাস্থ্য খাতে আস্থার সংকট প্রকট এবং তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন, এটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের অনাস্থার গণভোট। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল সংকটটি শুরু হয় আশির দশক থেকে, যখন রাষ্ট্র বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রণোদিত কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাত থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নেয়। স্বাস্থ্য আর নাগরিকের মৌলিক অধিকার থাকে না, হয়ে ওঠে একটি 'সেবা' যা বাজার দেবে। এই হলো নব্য-উদারবাদের মূল চাল। ফলে আমরা দেখি এক অদ্ভুত দ্বৈত ব্যবস্থা। একদিকে সরকারি হাসপাতাল যেখানে সেবা তাত্ত্বিকভাবে বিনামূল্যে, কিন্তু কার্যত অনুপস্থিত। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্ফোরণ। প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়কে সীমাবদ্ধ রাখতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি, কিন্তু সেই কাঠামো নেই। বাজার এখানে সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত।
এই পণ্যায়নের ফলে চিকিৎসা একটি সম্পর্ক থেকে একটি লেনদেনে পরিণত হয়েছে। ডাক্তার এখানে সার্ভিস প্রোভাইডার আর রোগী তার ক্লায়েন্ট। ডাক্তারকে টার্গেট দেওয়া হয়, কতগুলো টেস্ট লিখতে হবে, কতগুলো সিজার করতে হবে। ফলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে। এই সমস্যাটি কাঠামোগত। যখন একটি হাসপাতালের মুনাফা নির্ভর করে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর, তখন নৈতিকতাকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। ঢাকাই হলো বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক ক্ষমতা, সম্পদ, শিক্ষা, এবং চিকিৎসা। এটি আমাদের রাষ্ট্র-কাঠামোর চরিত্র। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই আমরা একটি কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র পেয়েছি, স্বাধীনতার পর সেই আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে ঢাকার বাইরে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকতে চান না। কেন চাইবেন? কারণ ঢাকার বাইরে তার সামাজিক মর্যাদা, তার সন্তানের ভালো স্কুল, তার স্ত্রীর কর্মসংস্থান, তার নিজের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বাজার কিছুই নেই। আমরা ডাক্তারদের দোষ দিই, কিন্তু আমরা কখনো প্রশ্ন করি না, রাষ্ট্র কীভাবে দেশকে বসবাসযোগ্য করার দায়িত্ব থেকে সরে গেছে।
এর ফল হলো, উপজেলা পর্যায়ে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ সামান্য জ্বর-সর্দিতেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায় না, কারণ সে জানে সেখানে ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। সে সরাসরি জেলা বা ঢাকায় যায়। ফলে প্রাথমিক স্তরে রোগ প্রতিরোধের যে ধারণা, তা ভেঙে পড়ে এবং বিশেষজ্ঞের ওপর চাপ বাড়ে। এটি একটি দুষ্টচক্র। প্রায়ই বলা হয়, বাংলাদেশে ডাক্তার-নার্সের সংখ্যা কম। এটি আংশিক সত্য। আসল সত্য হলো, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট কেবল সংখ্যার নয়, এটি সঠিক বণ্টন, দক্ষতার সমন্বয় ও কর্মপরিবেশেরও সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী প্রতি ১০,০০০ মানুষে একজন ডাক্তার থাকার কথা। বাংলাদেশে সেই সংখ্যা কাছাকাছি, কিন্তু সমস্যা হলো, এই ডাক্তারদের ৮০% শহরে, বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রীভূত। গ্রামে ডাক্তার নেই। আবার নার্সের সংকট আরও প্রকট। বাংলাদেশে ডাক্তার-নার্স অনুপাত উল্টো। বিশ্বে যেখানে ১ জন ডাক্তারের বিপরীতে ৩ জন নার্স থাকার কথা, বাংলাদেশে সেখানে ২ জন ডাক্তারের বিপরীতে ১ জন নার্স। এবং আছে দক্ষতার সংকট। দেশে রেকর্ডসংখ্যক চিকিৎসা স্নাতক তৈরি হলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা ও শিক্ষার মান নিয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। গত এক দশকে ব্যাঙের ছাতার মতো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ গজিয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অপ্রতুল ক্লিনিক্যাল সুযোগ, গবেষণার সংকট এবং মাননিয়ন্ত্রণের জরুরি চাহিদা এই সবই আজকের চিকিৎসা শিক্ষার বাস্তবতা। আমরা ডাক্তার তৈরি করছি, কিন্তু চিকিৎসক তৈরি করছি না। একটি মেডিকেল কলেজে যদি মর্গে লাশ না থাকে, ল্যাবে মাইক্রোস্কোপ না থাকে, হাসপাতালে রোগী না থাকে, তাহলে সেখানে কী শেখানো হয়? সেখানে কেবল ডিগ্রি বিক্রি হয়।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে এমএটিএস (MATS) এবং ভুয়া ডাক্তারের সংকট। দেশজুড়ে প্রায় ১০ হাজার ভুয়া চিকিৎসকের প্রতারণা ও দৌরাত্ম্য চলছে, এমবিবিএস চিকিৎসক ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে। রাষ্ট্র এই বিরোধকে মীমাংসা না করে ঝুলিয়ে রেখেছে, ফলে গ্রামীণ পর্যায়ে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী অর্ধ-প্রশিক্ষিত বা ভুয়া চিকিৎসকের হাতে জিম্মি। সবচেয়ে গভীর সংকটটি হলো আস্থার সংকট। একসময় গ্রামে ডাক্তার ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, প্রায় পরিবারের সদস্যের মতো। আজ ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্ক হয়ে উঠেছে সন্দেহ ও বৈরিতার সম্পর্ক। রোগী মনে করেন, ডাক্তার অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিচ্ছেন, ওষুধ কোম্পানি থেকে কমিশন খাচ্ছেন। ডাক্তার মনে করেন, রোগী তাকে শ্রদ্ধা করে না, যেকোনো সময় আক্রমণ করতে পারে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম কীভাবে হলো? এর জন্ম হয়েছে চিকিৎসাকে পণ্যে পরিণত করার মধ্য দিয়ে। যখন চিকিৎসা পণ্য, তখন ডাক্তার বিক্রেতা, রোগী ক্রেতা। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ভালোবাসা থাকে না, দরকষাকষি থাকে। এবং যখন রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা ছেড়ে দেয়, তখন এই দরকষাকষি হয়ে ওঠে হিংস্র। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মিডিয়া ট্রায়াল। একটি মৃত্যু হলেই, কোনো তদন্ত ছাড়াই, ডাক্তারকে খুনি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আবার ডাক্তারের অবহেলায় মৃত্যু হলেও, তার কোনো জবাবদিহি হয় না। কারণ স্বচ্ছতার অভাব ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে।
প্রচলিত আলোচনায় সমাধান হিসেবে বলা হয় বাজেট বাড়াও, ডাক্তার নিয়োগ দাও, যন্ত্র কিনো। এগুলো প্রয়োজন, কিন্তু যথেষ্ট নয়। কারণ সমস্যাটি কেবলমাত্র বাজেটের নয়, সমস্যাটি দৃষ্টিভঙ্গির। আমাদের একটি রূপান্তর দরকার, কেবল সংস্কার নয়। প্রথম কাজ হলো, স্বাস্থ্যকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সংবিধানে স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে সবকিছু সরকারি হয়ে যাবে, এর মানে হলো, রাষ্ট্র স্বীকার করবে যে প্রতিটি নাগরিকের মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার জন্মগত অধিকার, এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এর জন্য প্রয়োজন একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা বা জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস-এর মতো)। যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই একটি কার্ডের মাধ্যমে সেবা পাবে। সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল সেই বীমার আওতায় আসবে, এবং সরকার একটি একক ক্রেতা হিসেবে দরদাম করবে, ফলে চিকিৎসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এটি করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশ কেন পারবে না? একই সাথে প্রাইভেট সেক্টরের জন্য একটি কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা দরকার। ডায়াগনস্টিক টেস্টের দাম, বেড ভাড়া, সার্জারির ফি সবকিছুর একটি যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ করতে হবে। প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়কে সীমাবদ্ধ রাখতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় কাজ হলো, আমূল বিকেন্দ্রীকরণ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কেবল রেফারেল সেন্টার না বানিয়ে, একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে কেবল ডাক্তার পাঠালে হবে না, ডাক্তারের পরিবারের জন্য বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষা, বিনোদন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তারকে গ্রামে থাকার জন্য শুধুমাত্র আর্থিক প্রণোদনা নয়, একটি জীবন দিতে হবে। এবং ডাক্তারের সাথে নার্স, টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট এই পুরো টিমকে পাঠাতে হবে। একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন টেকনোলজিস্ট এই মডেলটি বাস্তবায়ন না করলে উপজেলা পর্যায়ে কখনোই মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, চিকিৎসা শিক্ষায় মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। যে সব প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই, রোগী নেই, ল্যাব নেই, তাদের অনুমোদন বাতিল করতে হবে। চিকিৎসা শিক্ষাকে বাজার থেকে মুক্ত করতে হবে। মেডিকেল শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে মেধার পাশাপাশি সেবার মানসিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের ডাক্তাররা রোগ চেনে, কিন্তু রোগী চেনে না। তারা জানে ডায়াবেটিস কী, কিন্তু জানে না একজন দরিদ্র রিকশাওয়ালার ডায়াবেটিস মানে কী। পাঠ্যক্রমে মেডিকেল এনথ্রোপলজি, পাবলিক হেলথ, বায়োএথিক্স যুক্ত করতে হবে।
চতুর্থত, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কল্পনাকে বদলাতে হবে। কেবল ডাক্তার-নির্ভর মডেল থেকে বেরিয়ে এসে কমিউনিটি-ভিত্তিক মডেলে যেতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় স্বাস্থ্যকর্মী, যারা প্রাথমিক স্ক্রিনিং করবে, স্বাস্থ্য শিক্ষা দেবে, এবং জটিল রোগীকে রেফার করবে। আমাদের যে বিশাল কমিউনিটি ক্লিনিক নেটওয়ার্ক আছে, তাকে কার্যকর করতে হবে। এবং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে ঢাকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার গ্রামের রোগীকে দেখতে পারেন। ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ডের মাধ্যমে রোগীর ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু প্রযুক্তি কখনোই মানুষের বিকল্প নয়, এটি সহায়ক মাত্র। প্রযুক্তির নামে যেন আবার নতুন বাণিজ্য শুরু না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সর্বশেষ, এবং সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, আস্থা ফিরিয়ে আনা। এর জন্য দরকার জবাবদিহি। ডাক্তারের অবহেলার জন্য যেমন শাস্তি হতে হবে, তেমনি ডাক্তারের ওপর হামলার জন্যও কঠোর শাস্তি হতে হবে। একটি স্বাধীন মেডিকেল ট্রাইব্যুনাল দরকার, যেখানে রোগী ও ডাক্তার উভয়ই ন্যায়বিচার পাবে। এবং দরকার সংলাপ। ডাক্তার, রোগী, রাষ্ট্র এই তিন পক্ষের মধ্যে যে দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি সামাজিক চুক্তি। সেই চুক্তিকে নতুন করে লিখতে হবে। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার সংকট। আমরা কী ধরনের রাষ্ট্র চাই? যে রাষ্ট্র নাগরিকের শরীরকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়, নাকি যে রাষ্ট্র শরীরকে অধিকার হিসেবে দেখে? উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপি বাড়া নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের মানবিক হয়ে ওঠা। একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা মাপা যায় সে তার অসুস্থ নাগরিকের সাথে কেমন আচরণ করে, তার দ্বারা। আজ যখন একজন গরিব মানুষ তার জমি বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসা করায়, যখন একজন মা বিনা চিকিৎসায় সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যায়, যখন একজন তরুণ ডাক্তার হতাশ হয়ে বিদেশে চলে যায়, তখন বুঝতে হবে, এই ব্যবস্থা আর চলতে পারে না। আমাদের একটি নতুন স্বাস্থ্য-কল্পনা দরকার, যেখানে চিকিৎসা হবে অধিকার, ডাক্তার হবেন সহযাত্রী, এবং রাষ্ট্র হবে অভিভাবক। এই কল্পনা ইউটোপিয়া নয়, এটি সম্ভব। শ্রীলঙ্কা পেরেছে, থাইল্যান্ড পেরেছে। আমরাও পারব, যদি আমরা সাহস করি ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে, যদি আমরা সাহস করি বাজারকে বলতে মানুষের শরীর নিয়ে মুনাফা নয়। চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার একটি রাজনৈতিক লড়াই, একটি সাংস্কৃতিক লড়াই, মানুষের শরীরের ওপর মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াই।
মন্তব্য করুন