বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১) অল্পের জন্য মহাকাশে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে একটি সতর্কবার্তা আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং তথ্যের সরকারি প্ল্যাটফর্ম ‘স্পেস ট্র্যাকার’ ওই সতর্কবার্তা পাঠায়।
বার্তায় জানানো হয়, বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১-এর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। সেটি খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। আর সংঘর্ষ হলে স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের হাতে তাই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য খুব বেশি সময় ছিল না। গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনে পরবর্তী কয়েক দিন চলে উদ্বেগ ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, কয়েক দিন অত্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে কাটলেও শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। স্যাটেলাইটটিকে নিরাপদে রক্ষা করা গেছে।
মহাকাশে শুধু সচল স্যাটেলাইটই ঘুরে বেড়ায় না। বিভিন্ন সময়ে উৎক্ষেপণ করা স্যাটেলাইটের অকেজো অংশ, নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের টুকরা এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশও পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এগুলোকে বলা হয় স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশের বর্জ্য।
মহাকাশে এসব বর্জ্যের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন সংস্থা। কোনো ডেব্রিস কোনো সচল স্যাটেলাইটের বিপজ্জনকভাবে কাছে চলে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়।
বিএসসিএলও এমন একটি সতর্কবার্তা পেয়েছিল। সেখান থেকে তারা জানতে পারে, বিএস-১-এর দিকে এগিয়ে আসা ধ্বংসাবশেষটি ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের।
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। তবে উৎক্ষেপণের কয়েক মাসের মধ্যেই স্যাটেলাইটটিতে সমস্যা দেখা দেয় এবং ১৯৮২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
সতর্কবার্তা পাওয়ার পর বিএসসিএলের প্রকৌশলীরা স্যাটেলাইটটির অবস্থান, ধ্বংসাবশেষের গতিপথ এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি বিশ্লেষণ শুরু করেন।
প্রয়োজনে বিএস-১-এর কক্ষপথ পরিবর্তন করা হবে কি না, পরিবর্তন করলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো নিরাপদ হবে এসব বিষয়ও হিসাব করতে হয়। কারণ স্যাটেলাইটকে নতুন অবস্থানে সরিয়ে নিলেও সেখানে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাদুর রহমান জানান, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কর্মীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়। স্পেস ট্র্যাকার থেকেও ধ্বংসাবশেষটির অবস্থান সম্পর্কে সময় সময়ে নতুন তথ্য পাঠানো হচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট বিএস-১-কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রকৌশলীরা। এরপর ধ্বংসাবশেষটি নিরাপদ দূরত্ব অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার হওয়ার পর স্যাটেলাইটটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।
বিএসসিএলের জন্য এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২১ ও ২০২৫ সালেও বিএস-১-এর সঙ্গে মহাকাশের অন্য বস্তুর সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
২০২১ সালে রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বিএস-১-এর জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। আর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বাংলাদেশের স্যাটেলাইটটির খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।
এ ধরনের ঘটনা মহাকাশে স্যাটেলাইট পরিচালনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ কক্ষপথে থাকা কোনো বস্তুর গতিপথ সামান্য পরিবর্তন হলেও তা অন্য স্যাটেলাইটের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
মহাকাশের ডেব্রিস বা অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার বড় উদাহরণ ২০০৯ সালের ঘটনা।
ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার অকেজো কসমস-২২৫১ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সচল যোগাযোগ স্যাটেলাইট ইরিডিয়াম-৩৩ মহাকাশে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়ে যায়।
এ ধরনের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পরবর্তী সময়ে অন্য স্যাটেলাইটের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১ তৈরি করেছিল ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণের পর শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায় স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে বিএসসিএল স্যাটেলাইটটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়।
গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনটি এখন বিএস-১ নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র। সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন এবং ২৪ ঘণ্টাই স্যাটেলাইটটির ওপর নজরদারি রাখা হয়।
বিএস-১-এর এই ঘটনা শুধু একটি সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানোর ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট পরিচালনায় প্রকৌশল সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামানের মতে, মহাকাশে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানোর বিষয়টি শুধু স্যাটেলাইটকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কক্ষপথ পরিবর্তনের হিসাব এবং সীমিত জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
বাংলাদেশি প্রকৌশলীরা অল্প সময়ের মধ্যে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন যা দেশের স্যাটেলাইট পরিচালনা ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমানও মনে করেন, মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে এলে দুর্ঘটনা এড়াতে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার বিষয়।
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইটটি। উৎক্ষেপণের সময় এর নাম ছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। পরে নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ রাখা হয়।
স্যাটেলাইটটিতে রয়েছে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং বাকি ২০টি দেশের বাইরের গ্রাহকদের জন্য ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিদেশে ট্রান্সপন্ডার ইজারা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের।
দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই স্যাটেলাইটের সেবা ব্যবহার করছে।
প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ও উৎক্ষেপণ করা বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইটটির জন্য সাম্প্রতিক এই ঘটনা ছিল আরেকটি বড় পরীক্ষা। মহাকাশের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি সফলভাবে এড়িয়ে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ নয়, কক্ষপথে সেটির নিরাপদ পরিচালনাও বাংলাদেশের মহাকাশ প্রযুক্তি সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মন্তব্য করুন