চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার প্রায় ২৪ শতক সরকারি সম্পত্তি ও এর ওপর প্রতিষ্ঠিত ভবন জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে একটি প্রভাবশালী পরিবার ও এক সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জমি ও বকেয়া ভাড়াসহ আত্মসাতকৃত মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুদক চট্টগ্রামের উপ-সহকারী পরিচালক সবুজ হোসেন বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত সাতজন হলেন—ফাতেমা বেগম (৯০), তার চার সন্তান মো. ফরিদ আহমদ, মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ, মোহাম্মদ ফয়েজ আহমদ, হাসিনা মমতাজ, রোকেয়া সুলতানা, শাহীন সুলতানা এবং গণপূর্ত চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ডবলমুরিং থানার গোসাইলডাঙ্গা মৌজার আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার লে-আউট প্ল্যানের ১৬ নম্বর প্লটের এই সম্পত্তিটি মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন। ১৯৫৮ সালে লিজ দেওয়া হলেও ১৯৭১ সালের পর থেকে এটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে ফাতেমা বেগমের ছেলে ও মেয়ে নামমাত্র চুক্তিতে মাসিক ভাড়ায় সম্পত্তিটির দখল নিলেও লিজ নবায়ন না করে এবং সরকারের পক্ষ থেকে দখল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার পরও তারা সেখানে অবস্থান করেন। একপর্যায়ে ফাতেমা বেগম ১৯৭০ সালের পটিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একটি পুরোনো দলিলের কথা বলে সেটির মালিকানা দাবি করেন।
কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রেকর্ডপত্র পুড়ে যাওয়ায় ওই দলিলের কোনো মূল বা সত্যায়িত কপি পাওয়া যায়নি। এমনকি ফাতেমা বেগম যে দলিলের কথা বলছেন, তার তারিখ ১৯ মে ১৯৭০ অথচ মূল দলিলদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বিক্রয় চুক্তি হয়েছিল প্রায় দুই মাস পর ৩ জুলাই। এছাড়া সেই সময়ের নথিতে বলপয়েন্ট কলমে স্বাক্ষরের মতো স্পষ্ট অসংগতিও ধরা পড়ে।
এই জালিয়াতির নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করেন গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক। কথিত ওই দলিল এবং অন্যান্য ভুয়া কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও সত্যায়িত করে তিনি মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দেন, যার ভিত্তিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি নামজারির অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে হেবা দলিলের মাধ্যমে সেই জমি সন্তানদের নামে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানে কনকর্ড ট্রেডিং, চিকিৎসাকেন্দ্র ও আগ্রাবাদ কনভেনশন হল পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভবনটি ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে।
দুদক জানিয়েছে, ২০২৫ সালের সরকারি মৌজা রেট অনুযায়ী ওই জমির মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি এবং ২০০৪ সাল থেকে বকেয়া ভাড়ার পরিমাণ ৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার অধিক। সব মিলিয়ে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন