স্পোর্টস ডেস্ক: বয়স মাত্র ১১ বছর। প্রতিপক্ষের একজনের বয়স ২৪, অন্যজনের ২৮। বয়সের বিশাল ব্যবধানকে পাত্তা না দিয়ে দুজনকেই হারিয়ে এশিয়ান গেমসে সোনার পদক জিতে নিয়েছে জাপানের ইউকি কুরিহারা। তবে এত বড় সাফল্যের পরও তার উদ্যাপনে ছিল না উচ্ছ্বাস। বরং লজ্জায় জয় উদ্যাপনের সময় ঠিকমতো অভিব্যক্তিই প্রকাশ করতে পারেনি এই খুদে চ্যাম্পিয়ন।
শনিবার পুয়ো পুয়ো চ্যাম্পিয়নসের ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার ২৪ বছর বয়সী কাং দংশিনকে ১০-২ ব্যবধানে হারিয়ে সোনা নিশ্চিত করে কুরিহারা। এর আগে সেমিফাইনালে থাইল্যান্ডের ২৮ বছর বয়সী তানারাক ওয়ংকিতকুনকে ১০-১ ব্যবধানে হারিয়েছিল সে। ফলে ফাইনালে ওঠার আগেই অন্তত রুপার পদক নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ১১ বছর বয়সী এই জাপানি খেলোয়াড়ের।
ফাইনালের শুরু অবশ্য কুরিহারার পক্ষে ছিল না। প্রথম গেমেই ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে যায় সে। কিন্তু এরপর দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা দারুণ পারফরম্যান্স করে শেষ পর্যন্ত ১০-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয় কুরিহারা।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তার উদ্যাপন ছিল একেবারেই শান্ত। অন্য অনেক চ্যাম্পিয়নের মতো উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করে বরং লাজুকভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। পরে এর কারণও জানিয়েছে কুরিহারা।
তার ভাষায়, ‘সত্যি বলতে, আমি একটু লজ্জা পেয়েছিলাম। তাই ঠিকমতো অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারিনি, মুখের ভাবও খুব একটা পরিবর্তন করতে পারিনি।’
পোডিয়ামে উঠে অবশ্য সোনার পদক গ্রহণের সময় সামান্য ঝুঁকে অভিবাদন জানায় কুরিহারা। এরপর দর্শকদের দিকে ছোট্ট করে হাত নাড়ে। মাত্র ১১ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের জন্য মুহূর্তটি ছিল ঐতিহাসিক, অথচ তার প্রতিক্রিয়ায় ছিল শিশুসুলভ সরলতা ও শান্ত ভাব।
সোনার পদক হাতে পাওয়ার অনুভূতি অবশ্য লুকায়নি কুরিহারা। পদকটি নিয়ে তার উচ্ছ্বাসও ছিল বেশ মিষ্টি। সে বলে, ‘আমি সত্যিই খুব খুশি। সোনার পদকটা খুব সুন্দর, চকচকে ও ভারী।’
এশিয়ান গেমস থেকে পাওয়া স্মারক প্লাশ খেলনাটিও বেশ পছন্দ হয়েছে কুরিহারার। সেটিও সোনালি রঙের হওয়ায় আরও ভালো লেগেছে তার। কুরিহারা বলে, ‘প্লাশ খেলনাটাও খুব সুন্দর। আর সেটাও সোনালি রঙের, এটা দারুণ।’
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে থাকতেই পুয়ো পুয়ো খেলা শুরু করেছিল কুরিহারা। সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সে। বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে বয়সে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে সাফল্যও পেতে শুরু করে।
চলতি বছরের এপ্রিলে পেশাদার খেলোয়াড়ের লাইসেন্সও পেয়ে যায় কুরিহারা। এরপর নিয়মিতভাবে বড়দের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাফল্য অর্জন করতে থাকে সে।
এশিয়ান গেমসে অংশ নেওয়ার আগে কুরিহারা জানিয়েছিল, স্কুলের পড়াশোনা, ক্র্যাম স্কুল বা অতিরিক্ত পড়াশোনার পাশাপাশি পুয়ো পুয়োর প্রস্তুতি নেওয়া সহজ নয়। তবে খেলাটি তার কাছে বেশ উপভোগ্য।
কুরিহারা বলেছিল, ‘স্কুল আর ক্র্যাম স্কুলের সঙ্গে এটা সামলানো কঠিন। তবে এটা সত্যিই অনেক মজার।’
পুয়ো পুয়ো চ্যাম্পিয়নস মূলত একটি পাজল গেম। খেলায় পর্দায় বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট ব্লব জমতে থাকে। একই রঙের ব্লব নির্দিষ্টভাবে মিলিয়ে সেগুলো সরিয়ে ফেলতে হয়। দ্রুত ও কৌশলের সঙ্গে নিজের পর্দা পরিষ্কার করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের দিকে বাধা তৈরি করতে পারাই জয়ের অন্যতম কৌশল।
সোনার পদক জেতার পাশাপাশি কুরিহারা জাপানের এশিয়ান গেমস ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে। মাত্র ১১ বছর বয়সে অংশ নিয়ে সে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী এশিয়ান গেমস অ্যাথলেট হয়েছে।
এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী পদকজয়ীর নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনীন কোনো পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড অবশ্য নেই। তবে এর আগেও কিশোর বয়সে এশিয়ান গেমসে পদক জয়ের নজির রয়েছে।
২০১৮ সালের জাকার্তা এশিয়ান গেমসে ইন্দোনেশিয়ার বুংগা নিয়ামাস ১২ বছর বয়সে মেয়েদের স্কেটবোর্ডিংয়ে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল। এরপর ২০২৩ সালের হাংজু এশিয়ান গেমসে চীনের চুই চেনসি ১৩ বছর বয়সে মেয়েদের স্ট্রিট স্কেটবোর্ডিংয়ে সোনা জেতে।
সেই তালিকায় এবার নিজের নামও যুক্ত করল কুরিহারা। তবে মাত্র ১১ বছর বয়সী এই চ্যাম্পিয়নের কাছে এ মুহূর্তে হয়তো রেকর্ডের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার হাতে পাওয়া চকচকে, ভারী সোনার পদক আর সোনালি রঙের ছোট্ট প্লাশ খেলনাটি।
মন্তব্য করুন