যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ওয়াশিংটনের কাছে ‘প্রতারিত’ হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এই চুক্তিকে বহু ইসরাইলি এবং স্থানীয় বিশ্লেষক ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও একটি ‘লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তেল আবিব থেকে ১২ মাইল দূরে অবস্থিত এবং ইসরাইলি ভোটারদের মানসিকতা পরিমাপের আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত রেহোভোত শহরে আসা মানুষেরা মনে করছেন, এই চুক্তির কারণে ইসরাইল আগের চেয়েও বেশি বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং এই বিপদের মুখোমুখি তাদের একাই হতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ফলে ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা:
ইরানের পুনর্গঠনের সুযোগ: এই চুক্তির ফলে ইরান যুদ্ধের আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে ইসরাইলিরা আশঙ্কা করছেন।
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধতা: লেবাননের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই চুক্তি ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে, যা দেশটির উত্তর অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি।
সামরিক উত্তেজনা: এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই লেবাননে নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে। হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরাইলি বিমানবাহিনীর পাল্টা হামলায় ১৮ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়েছেন।
লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা: সমালোচকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল পুরোপুরি নির্মূল করার মতো যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জনে ইসরাইল চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ যুদ্ধ শুরু করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইল ওয়াশিংটনের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরাইলকে একটি ‘ছোট শক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর পরিবর্তে কটু কথা ও সমালোচনা শুনিয়েছেন। বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের অনবরত হামলায় ৩,৯০০-এরও বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ওয়াশিংটন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি থাকা ৭৬ বছর বয়সি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে:
জনগণের আস্থা সংকট: ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলায় ১,২০০ জন নিহত ও ২৫০ জন অপহৃত হওয়ার পর থেকেই নেতানিয়াহুর ওপর সমর্থকদের আস্থা কেঁপে ওঠে।
বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা: গাজায় ইসরাইলের নৃশংস অভিযানে ৭৩,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ইসরাইল একঘরে হয়ে পড়েছে। বর্তমানে গাজার ৭০ শতাংশ ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বাকি অংশের ওপর এখনো হামাসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
আসন্ন নির্বাচন: আগামী অক্টোবরে ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যাকে দেশের জন্য একটি বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভোটারদের মনোভাব: এত কিছুর পরও ৪৩ শতাংশ মানুষ ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য নেতানিয়াহুর জোটের পক্ষেই মত দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাঁকে শেষ মুহূর্তে চাল বদলাতে পারদর্শী রাজনীতির ‘যাদুকর’ বলে অভিহিত করেছেন।
তবে দেশের ভেতরের এই চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বিভক্তির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেক নাগরিকই এখন মনে করছেন যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের আর কোনো নির্ভরযোগ্য বন্ধু নেই এবং তাদের চিরকাল তরবারির ওপর ভর করেই বেঁচে থাকতে হবে।
মন্তব্য করুন