গত বছরের ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি চলাকালে হাইকোর্টের সামনে উত্তাল রাজপথে টিয়ারশেল ও পুলিশের পৈশাচিক তাণ্ডবের মাঝে হঠাৎ একদল পুলিশ নির্মমভাবে চেপে ধরেছিল এক তরুণের মুখ। স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে চিরতরে রুদ্ধ করে দিতে চাওয়া সেই তরুণ আর কেউ নন, নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের সাহসী শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা নাহিদুল ইসলাম। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন বা ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বইয়ের পাতায় পড়া এই তরুণ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিজেই রাজপথে নেমে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় রচনা করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি বসে যখন তিনি সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করছিলেন, তখন বারবার তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জলের ধারা। নাহিদের মতে, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো পূর্বপরিকল্পিত ছকে হয়নি, বরং এটি জন্ম নিয়েছিল একটি যৌক্তিক ও ন্যায্য আন্দোলনের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ঐতিহাসিক এক দফা দাবিতে।
পুলিশের হিংস্র থাবা এড়িয়ে বুক পেতে বুলেটের আঘাত নেওয়া নাহিদের শরীর ও মনের ক্ষত আজও শুকায়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই রক্তাক্ত ছবি দেখে গোটা দেশের মানুষ শিউরে উঠলেও, সেই বুলেটের জ্বালা এবং সহযোদ্ধাদের আর্তনাদ আজও তার অন্তরে গভীরভাবে গেঁথে আছে। ভয়াল সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আজও তার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে, রাতের আঁধারে আতঙ্কে লাফিয়ে ওঠেন তিনি। ১৬ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর কারফিউ ভাঙার মতো চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা স্মরণ করে নাহিদ জানান যে দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকেই তারা মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের পতন অনিবার্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি সেই স্বৈরাচারের পতন না ঘটানো যেত, তবে আজ এ দেশের মানুষের বেঁচে থাকার বা কথা বলার কোনো অধিকারই অবশিষ্ট থাকত না।
তবে বিপ্লব ও স্বৈরাচারের পতনের পরও নাহিদের বুকজুড়ে রয়েছে চরম হতাশা ও ক্ষোভ। রাজপথের রক্তভেজা সেই তরুণদের আজ যেভাবে সুকৌশলে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তার চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান যে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করা মানুষগুলো আজ সমাজ থেকে প্রায় বিলুপ্তির পথে। বিপ্লবের মূল সুফলভোগী কারা এমন প্রশ্নের জবাবে নাহিদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে বর্তমানে মধ্যস্বত্বভোগী ও সুশীল সমাজের মুখোশধারী কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি, যারা দেশের প্রতিটি শ্রেণি-পেশাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ক্ষমতার কেবল রদবদল নয়, বরং দেশের সাধারণ শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তন দেখতে চান এই তরুণ যোদ্ধা। নাহিদের ভাষায়, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নেই। তিনি চান প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের পাশাপাশি ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত হোক। বুলেটের রক্তে ভেসে যাওয়া নাহিদের মতো হাজারো তরুণের বুকচেরা আর্তনাদ আর সুশীলতার মুখোশধারী শোষকদের প্রতি এই তীব্র ধিক্কার আজও এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন হয়ে তাড়া করে ফিরছে পুরো জাতিকে।
মন্তব্য করুন