দেশে সুনির্দিষ্টভাবে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তা কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে সামনে আনার জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রথিতযশা চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, কেবল ‘সংস্কার’ শব্দটি ব্যবহার করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ঠিক কোন কোন জায়গায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি, তা নির্দিষ্ট করতে হবে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর যুগান্তর কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
সংস্কারের তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক তফাত তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘রিফর্ম’ বা সংস্কার এবং ‘ট্রান্সফর্ম’ বা রূপান্তরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ২৪-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন রাস্তাঘাটে বা দেওয়ালে ‘স্বাধীনতা এনেছে সংস্কার ও আন্দোলন’ এ ধরনের স্লোগান বা লেখা দেখা গেছে, যা দেখে মনে হতে পারে যেন এই পুরো আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই ছিল কেবল সংস্কার করা। কিন্তু সংস্কার করতে হলে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট একটি তালিকা থাকা দরকার, যেখানে পরিষ্কার উল্লেখ থাকবে যে আমরা আসলে ঠিক কী কী সংস্কার করতে চাই।
দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, দেশ আগামী দিনে প্রচলিত প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে নাকি সংসদীয় বা প্রধানমন্ত্রী পদ্ধতিতে চলবে—কার ক্ষমতা ঠিক কতটা বেশি থাকবে, নাকি দুজনের ক্ষমতার ভারসাম্য সমান রাখা হবে, সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও সংস্কারের মূল আলোচনায় অবশ্যই নিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পঠনপাঠন ও দাপ্তরিক কাজে কোন ভাষা ব্যবহার করা হবে, সেটিও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি অত্যন্ত অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে তিনি জোরালোভাবে উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের একপর্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) তরুণ নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে সলিমুল্লাহ খান বলেন, বর্তমান সময়ের আলোচিত এনসিপির তরুণেরা কিছুটা ছদ্মাবাস ধারণ করেছে এবং এই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তাদের পক্ষ থেকেও জোরালো কোনো বক্তব্য বা পরিষ্কার অবস্থান দেখা যায়নি।
বক্তব্যের ভেতরে রসিকতার চমৎকার আশ্রয় নিয়ে তিনি এ সময় উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বলেন, “শ্বশুর বলেছিল, জামাই কথা বলতে খুব ভালো জানে। বলে থামতে জানে তো? তো আমাদের থামতে জানতে হবে।” বক্তাদের বক্তব্যের দীর্ঘসূত্রিতা ও সময়ের কথা মাথায় রেখেই তিনি এই রসিকতা করেন এবং সংস্কারের একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত তালিকা তৈরির ওপর পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে আজকের এই বিশেষ সভা থেকেও চাইলে সেই সংস্কারের একটি খসড়া তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে।
সভায় বিশিষ্ট লেখক আহমদ ছফার একটি জনপ্রিয় বক্তব্যের উদ্ধৃতি টেনে তিনি বলেন, “বুদ্ধিজীবীরা যা বলেছেন তা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।”
দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক আবদুল হাই শিকদারের সভাপতিত্বে এবং পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি কাজী জেবেলের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ, প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সিসিআরএসবিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মাহফুজ পারভেজ, এবং প্রবীণ সাংবাদিক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আবু রুশদসহ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনেরা।
মন্তব্য করুন