দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি গোপালগঞ্জগামী ট্রেনের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হচ্ছে আজ। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে, যা এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
আজ সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেল ৫টায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর রেলস্টেশনে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বহুল প্রতীক্ষিত এই ট্রেনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান সেলিম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য কে এম বাবর।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন স্বাক্ষরিত অফিশিয়াল অফিস আদেশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্বোধনের দিনে আজ দুপুর আড়াইটায় ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ নামের ট্রেনটি রাজধানী ঢাকা থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে গিয়ে পৌঁছাবে। এরপর পুনরায় একই দিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকায় ফিরে আসবে।
নিয়মিত রুটিন অনুযায়ী পরবর্তীতে ট্রেনটির নির্ধারিত সময়সূচি হচ্ছে—প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে ট্রেনটি সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে। অন্যদিকে বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ গোপালগঞ্জ থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে সেটি ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। যাত্রীদের সুবিধার্থে সপ্তাহের প্রতি শনিবার এই ট্রেনটির চলাচল সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে।
ঢাকা থেকে ছেড়ে গোপালগঞ্জ যাওয়ার পথে ট্রেনটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। এর মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগর, মাওয়া, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা এবং মহেশপুর স্টেশন। ফলে এসব এলাকার যাত্রীরাও সহজেই এই ট্রেন পরিসেবার সুফল ভোগ করতে পারবেন।
মোট ৮টি আধুনিক কোচ নিয়ে গঠিত ৬০৯ আসনবিশিষ্ট এই কমিউটার ট্রেনে সাধারণ শ্রেণির যাত্রীদের জন্য সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১৪৫ টাকা। যেখানে সড়কপথে বাসে করে ঢাকা যাতায়াত করতে সাধারণ যাত্রীদের সাধারণত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ করতে হয়, সেখানে অত্যন্ত সাশ্রয়ী এই ভাড়ার কারণে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের মনে দারুণ স্বস্তি ফিরে এসেছে। শুধু গোপালগঞ্জবাসীই নয়, বরং এর মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী পিরোজপুর, বাগেরহাট এবং নড়াইল জেলার সাধারণ মানুষও সরাসরি উপকৃত হবেন।
রাজধানীর সাথে সরাসরি নিরাপদ রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার খবরে পুরো গোপালগঞ্জজুড়ে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সময় ও যাতায়াত খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি এই নিরাপদ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি গতিশীল নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে স্থানীয়রা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
গোপালগঞ্জের ইসলামপাড়ার বাসিন্দা ওসিকুর রহমান খান জানান, স্বল্প খরচে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি এই রেল যোগাযোগ আমাদের এলাকার সার্বিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে। সড়কপথের দীর্ঘ যানজট এড়াতে কম ভাড়ার এই ট্রেনটি ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
গোপালগঞ্জের রেলযান পরীক্ষক পল্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের বহুকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন আজ বাস্তব রূপ লাভ করছে। গোপালগঞ্জ একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ কৃষিপ্রধান অঞ্চল। ভবিষ্যতে যদি এই ট্রেনের সাথে অতিরিক্ত লাগেজ ভ্যান বা পার্সেল কোচ যুক্ত করা হয়, তবে স্থানীয় কৃষকরা অত্যন্ত নামমাত্র খরচে তাঁদের উৎপাদিত তাজা শাকসবজি ও কৃষি পণ্য সরাসরি রাজধানী ঢাকার বড় বাজারে পাঠাতে পারবেন।
কাশিয়ানী রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার অনিক বিশ্বাস জানান, এর আগে রাজশাহী রুটে ট্রেন চলাচল করলেও রাজধানী ঢাকার সাথে গোপালগঞ্জের কোনো সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল না। আজ থেকে এই রুটে সার্ভিসটি চালু হওয়ায় সড়কপথের দীর্ঘ যানজট ও অতিরিক্ত বাস ভাড়ার চরম ভোগান্তি থেকে যাত্রীরা মুক্তি পাবেন। একই সাথে যাত্রীদের আশানুরূপ সাড়া মিললে সরকারের রেল খাতের রাজস্ব আয়ও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
মন্তব্য করুন