‘তুমি ক্লাসে ফেল করেছ, জীবনে আর কিচ্ছু করতে পারবে না’—সমাজের এই প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা বহু শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্বকে চিরতরে ভেঙে দেয়। অথচ পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সফল ও প্রভাবশালী মানুষগুলোর অনেকেই একসময় স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। কিন্তু তারা কখনো হাল ছাড়েননি। বরং জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতাকে নিজেদের মূলধন এবং আত্মবিশ্বাসকে চালিকাশক্তি বানিয়ে প্রচলিত সনদ ও শিক্ষাকে পেছনে ফেলে তারা আজ পুরো পৃথিবীর লাখো তরুণের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।
এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো তেমনই কিছু বিশ্বখ্যাত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, যারা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে জীবনে সফল হওয়ার জন্য গাণিতিক নম্বর নয়, বরং প্রয়োজন সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, বুকভরা সাহস আর অদম্য পরিশ্রম।
চীনের বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জ্যাক মা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শতবার প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। তার জীবনের শুরুর দিককার ব্যর্থতাগুলো যেকোনো মানুষকে হতাশ করার মতো ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার গণিত অংশে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ১ নম্বর। এভাবে তিনবার চেষ্টা করেও নিজের পছন্দের ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাকে ভর্তি হতে হয়েছিল হ্যাংঝৌ নরমাল ইউনিভার্সিটিতে, যেটাকে সে সময় স্থানীয়ভাবে ‘চতুর্থ শ্রেণির’ বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো।
পড়াশোনা শেষের পর চাকরির বাজারেও তার ভাগ্য ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। একবার কেএফসিতে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন, যেখানে মোট ২৪ জনের মধ্যে ২৩ জন চাকরি পেলেও বাদ পড়েছিলেন কেবল একা জ্যাক মা। পুলিশের চাকরির ইন্টারভিউয়ে গিয়েও তাকে একই ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এতকিছুর পরও জ্যাক মা কখনো ভেঙে পড়েননি বা হতাশায় ডুবে যাননি। জীবনের সব বাধা পেরিয়ে নিজ বাড়ির ছোট্ট একটি ঘর থেকে মাত্র ১৮ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে তিনি শুরু করেন আলিবাবার অভিযাত্রা। শুরুর দিকে কেউ তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা ভিশনে বিশ্বাস রাখেনি। এমনকি তৎকালীন সময়ে প্রায় ৩০ জন বড় বিনিয়োগকারী তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু নিজের মেধা ও স্বপ্নের ওপর অবিচল আস্থা রেখেছিলেন তিনি। আজ তার হাতে গড়া আলিবাবা একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি এবং তিনি নিজে তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
প্রযুক্তি জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস কলেজ জীবন শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেননি। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার গণ্ডির প্রতি তার তেমন কোনো আগ্রহ বা মনোযোগ ছিল না, তবে কম্পিউটার প্রযুক্তি, নিখুঁত ডিজাইন আর নতুন কিছু উদ্ভাবনের অসাধারণ চিন্তায় তিনি ছিলেন অনন্য। মাত্র কুড়ি বছর বয়সে একটি সাধারণ গ্যারেজে বসেই তিনি গড়ে তোলেন আজকের বিখ্যাত অ্যাপল কোম্পানি। জীবনের নানা মানসিক যন্ত্রণা, কঠিন চ্যালেঞ্জ আর নিজ প্রতিষ্ঠানের চরম ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই তিনি সামনে এগিয়ে গেছেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তাকে নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান অ্যাপল থেকেই বের করে দেওয়া হয়েছিল। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা জয় করে আরও দুর্দান্তভাবে ফিরে এসে তিনি উপহার দিয়েছেন আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকবুকের মতো বিশ্ব বদলানো সব প্রযুক্তি পণ্য।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও প্রাতিষ্ঠানিক প্রথাগত শিক্ষার প্রচলিত পথ মাড়াননি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা সম্পূর্ণ শেষ করেননি। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও কেবল নিজ মেধা, দূরদর্শিতা আর প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জোরে তিনি গড়ে তোলেন মাইক্রোসফট কর্পোরেশন, যা আজ বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। তিনি গোটা পৃথিবীকে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, পকেটে বড় কোনো ডিগ্রি থাকলেই মানুষ বড় হয় না; বরং মানুষের বড় পরিচয় লুকিয়ে থাকে তার মহৎ চিন্তা, নতুন কিছু তৈরির ক্ষমতা আর সাহসী পদক্ষেপে।
ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সফল শিল্পপতিদের একজন ছিলেন ধীরুভাই আম্বানি। স্কুলজীবনে পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একদম সাধারণ মানের একজন শিক্ষার্থী। তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও খুব বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু তার অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তা, যেকোনো বড় ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার অসম্ভব সাহস এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রম তাকে সাফল্যের আকাশচুম্বী শিখরে নিয়ে গেছে। জীবনের শুরুতে ছোট্ট একটি মুদির দোকান থেকে শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, যা বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে বৃহত্তম ও শক্তিশালী শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও সফল প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলজীবনে ছিলেন অত্যন্ত অমনোযোগী এবং দুর্বল একজন ছাত্র। পড়াশোনায় বারবার ফেল করার কারণে স্কুলের শিক্ষকরা পর্যন্ত তাকে নিয়ে হতাশ হয়ে বলতেন যে, এই ছেলে জীবনে কিচ্ছু করতে পারবে না। অথচ ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুর্যোগপূর্ণ দিনে তিনি ব্রিটেনকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে রক্ষা করেছিলেন। চার্চিল জীবনে কোনো দিন চরম প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। সময়ের স্রোত পেরিয়ে তিনি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন এক অদম্য যুদ্ধনায়ক ও সফল কূটনীতিক হিসেবে এবং অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেছিলেন মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারও।
শিক্ষাগত জীবনের যেকোনো ব্যর্থতা বা পরীক্ষায় খারাপ ফলাফল অনেকের কাছেই জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা বা বিপর্যয় মনে হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই জীবনের শেষ কথা নয়। ওপরে উল্লিখিত প্রতিটি সফল মানুষের জীবনই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে যে, যারা নিজের অন্তরের স্বপ্নে অবিচল আস্থা রাখে এবং কঠোর পরিশ্রমে কখনো ক্লান্ত হয় না, তারাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন ধাক্কা সামলে একদিন দ্বিগুণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়। পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার পর আপনি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে কী করছেন, সেটাই আসল ব্যাপার। প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে আপনি কী শিক্ষা পেলেন, সেই অভিজ্ঞতাই হয়ে ওঠে আপনার ভবিষ্যতের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি। সঠিক সময়, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর অদম্য সাহসিকতা এই তিনটি গুণই যেকোনো হতাশ মানুষকে সাফল্যের চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে।
মন্তব্য করুন