|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : Jun 20, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

হাইতির মুসলিমদের অনন্য পথচলা

ক্যারিবীয় সাগরের দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। ছবি: সংগৃহীত

ক্যারিবীয় সাগরের বুকে ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নিরাপত্তা সংকটের আড়ালে দেশটিতে লুকিয়ে আছে মুসলিমদের এক বিস্ময়কর ইতিহাস ও সংগ্রামের গল্প। শতাব্দী ধরে দাসত্ব, নিপীড়ন, ধর্মীয় সংকোচন ও নানা সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও হাইতির মুসলিমরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। আফ্রিকা থেকে আগত মুসলিম দাসদের উত্তরাধিকার বহন করে আজকের হাইতির মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনার পথে, যা বিশ্বাস ও পুনর্জাগরণের এক অনন্য অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি।

দাসপ্রথার অন্ধকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে অবদান

হাইতিতে ইসলামের আগমন ও দেশটির independence সংগ্রামে মুসলিমদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হাইতিতে ইসলামের ইতিহাস প্রায় পাঁচ শতাব্দী পুরোনো। ১৫০২ সালের দিকে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ দাসকে এস্পানিওলা দ্বীপে (বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র) নিয়ে আসা হয়, যাদের একটি বড় অংশই ছিলেন মুসলিম। ঔপনিবেশিক শাসকদের নির্মম নির্যাতন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের কারণে অনেকে ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ্যে ধরে রাখতে না পারলেও তাদের সংস্কৃতির কিছু ছাপ আজও হাইতির লোকজ ঐতিহ্যে রয়ে গেছে।

১৭৯১ থেকে ১৮০৪ সালের হাইতিয়ান বিপ্লবের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বাধীন স্বাধীন রাষ্ট্র এবং লাতিন আমেরিকার প্রথম দাসপ্রথামুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে হাইতি। ঐতিহাসিকদের মতে, এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নেতা দুতি বুকম্যান ছিলেন ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি, যাঁর আত্মত্যাগ স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুনকে আরও জ্বালিয়ে তুলেছিল।

ইসলামের পুনর্জাগরণ ও প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা

দীর্ঘ সময় নিস্তেজ থাকার পর বিংশ শতাব্দীতে হাইতিতে নতুন করে ইসলামের বিকাশ শুরু হয়। ১৯২০-এর দশকে মরক্কোর ফেজ অঞ্চল থেকে কয়েকটি মুসলিম পরিবার হাইতিতে বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় মুসলিমদের সহযোগিতায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষার বোধ জাগ্রত হতে থাকে।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন কোনো নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না। অবশেষে ১৯৮৫ সালে একটি আবাসিক ভবনকে মসজিদে রূপান্তর করে মিনার নির্মাণের মাধ্যমে হাইতির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মুসলিম সমাজের ঐক্য ও শিক্ষার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে নাভুন মার্সেলুস দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, যা হাইতির মুসলিমদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

ভূমিকম্পের দুর্যোগ থেকে নতুন সম্ভাবনা

২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প হাইতিতে এক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। এই দুর্যোগের সময় বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম সংস্থা ও মানবিক সংগঠনের সেবামূলক কার্যক্রম এবং নিঃস্বার্থ সহযোগিতা স্থানীয় মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে। ফলে ইসলাম সম্পর্কে স্থানীয়দের আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর সুবাদে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষা কার্যক্রমের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে।

মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান বিস্তার

বর্তমানে হাইতির বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গোনাভিস অঞ্চলে অবস্থিত ‘মসজিদুল মুনাওয়ার’ স্থানীয় মুসলিমদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানি শান্তিরক্ষী কর্মকর্তা মেজর সাইফুল্লাহর উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদটি বর্তমানে নামাজ, শিক্ষা ও দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পাশাপাশি ইমাম আবদুল আল-আলির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘ফাতিহা মসজিদ’ হাইতির ইসলামি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বহু মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া মিরাগোয়ান অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ‘দারুল উলুম’ বর্তমানে হাইতির মুসলিম সমাজের দ্বীনি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র, যা নতুন প্রজন্মকে ইসলামের জ্ঞানে আলোকিত করছে। এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ে ইসলামি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমান বাস্তবতা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ

উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও হাইতির মুসলিম সমাজকে এখনও বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দেশটির সরকার এখনো ইসলামি বিবাহব্যবস্থা ও কিছু ধর্মীয় কার্যক্রমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। এর পাশাপাশি সামগ্রিক নিরাপত্তা সংকট, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং সীমিত ধর্মীয় অবকাঠামো তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তবে এই সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও তারা সীমিত সম্পদ নিয়ে শিক্ষা ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল: সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ

1

৬০ নিত্যপণ্যে উৎসে কর কমছে

2

শবেকদর আসলে কোন রাতে? জেনে নিন হাদিসে বর্ণিত বিশেষ আলামতগুলো

3

তিন বিভাগে অতি ভারি বর্ষণের শঙ্কা

4

ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লিফলেট তৈরি, গ্রেফতার ২

5

ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাইল ইনকিলাব মঞ্চ

6

বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে: অ্যাটর্নি জেনারেল

7

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি: ৫টি বড় ঝুঁকির মুখে

8

বিসিবি এখন ‘বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ড’: হাসনাত আব্দুল্লাহর কড়

9

বাস-ট্রাকের অগ্রিম আয়কর বাড়ছে

10

৫ অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালো সরকার

11

হরমুজ প্রণালিতে আটকা বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’: ৩১ ন

12

আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

13

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ২০২৬: কেন যুদ্ধের বিস্তার তেহরানের পক্ষেই

14

যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ছে কোভিডের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘সিকাডা’:

15

রপ্তানি ধরে রাখতে কঠোর প্রতিযোগিতার তাগিদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

16

‘হ্যাঁ’ ভোটদাতাদের নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এবি পার্টি

17

ইউক্রেনের খারকিভে রুশ ড্রোন হামলা, তরুণীসহ নিহত ৪

18

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে নারী ওয়ানডে দল ঘোষণা: নতুন মুখ জয়িতা, ফ

19

‘চোখের বদলে চোখ’, মার্কিন-ইরান যুদ্ধ নিয়ে সতর্কবার্তা

20