সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি তুলার কারখানায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃতি সন্তান শ্যামল উদ্দীন মাঝি (৪৫)। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর তার নিজ বাড়ি রাজশাহীর বাগমারার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরু গ্রামের ডাঙ্গাপাড়ায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতের বাড়িতে চলছে স্বজনদের কান্নার রোল এবং চারপাশের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে শোকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে আজ পুরোপুরি বাকরুদ্ধ ও দিশাহারা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে শোকার্ত পরিবারের সদস্যরা আকুল আবেদন জানিয়েছেন যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিহত শ্যামল উদ্দীনের মরদেহ সৌদি আরব থেকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে এনে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার ব্যবস্থা করা হয়। গত সোমবার (১০ আগস্ট) বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহম্মেদ নিহতের বাড়িতে গিয়ে শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং সমবেদনা জানান। তিনি পরিবারের উদ্দেশ্যে আশ্বস্ত করে বলেন যে, প্রবাসীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক কাজ করা হচ্ছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায় যে, জীবিকার তাগিদে এবং পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করার সুকঠিন লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে চড়া সুদে ঋণ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শ্যামল উদ্দীন মাঝি। সেখানে একটি তুলার কারখানায় দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে তিনি একে একে বিদেশের যাওয়ার সমস্ত ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। এরপর দেশে থাকা পরিবারের জন্য একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন, যদিও সেই কাজ তিনি নিজের চোখে পুরোপুরি শেষ করে যেতে পারেননি। নিহতের স্ত্রী রশিদা বিবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান যে, চলতি মাসের ১৪ তারিখেই তার স্বামীর দেশে ফিরে আসার কথা ছিল। দেশে ফিরে অসম্পূর্ণ থাকা বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা তিনি ফোনে বারবার বলতেন এবং বিশেষ করে তাদের দ্বিতীয় মেয়ে নাদিয়ার আক্দ বা বিয়ের চমৎকার পরিকল্পনাও করে রেখেছিলেন। এ নিয়ে মৃত্যুর আগের রাতেও স্ত্রীর সাথে তার বিস্তারিত কথা হয়েছিল। কিন্তু কে জানত, পরদিন সকালেই তার সাথে কারখানায় কাজ করা সহকর্মীদের ফোনকলের মাধ্যমে জানতে হবে যে কারখানায় সংঘটিত আকস্মিক ভয়াবহ আগুনে পুড়ে তার স্বামী মারা গেছেন। স্ত্রী রশিদা বিবি আরও জানান যে তাদের কোনো পুত্রসন্তান নেই, তিন মেয়ে নিয়েই তাদের সংসার। বড় মেয়ের বিয়ে আগেই হয়ে গেলেও দেশে ফিরে মেজো মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সব প্রস্তুতি তার স্বামীর মনে ছিল। মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের সাজানো সব স্বপ্ন মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেল।
নিহতের বড় মেয়ে শামীমা আক্তার তার বাবার মরদেহ অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়ে সরকারের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি জানান যে তারা যেকোনো মূল্যে তাদের বাবার মরদেহ শনাক্ত করে নিজ মাতৃভূমিতে ফেরত আনতে চান, যাতে শেষবারের মতো বাবার মুখটি দেখে তাকে শেষ বিদায় জানাতে পারেন। মেজো মেয়ে নাদিয়া কাঁদতে কাঁদতে জানায় যে তার বাবা সবসময় তাদের তিন বোনকে নিয়ে নানা পরিকল্পনা করতেন এবং তাদের সুখের কথা ভেবেই প্রবাসের মাটিতে এত কষ্ট সহ্য করতেন। এদিকে বাগমারার ঝিকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান যে, সৌদি আরবের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসী শ্যামল উদ্দীন মাঝির মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তারা পরিবারের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর রাখছেন। প্রসঙ্গত, গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদের একটি কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ১৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে রাজশাহীর বাগমারার এই ভাগ্যাহত শ্যামল উদ্দীন ছাড়াও নওগাঁ ও নাটোর জেলার বেশ কজন শ্রমিক রয়েছেন।
মন্তব্য করুন