সুন্দরবনের গহিনে মৌমাছিরা যখন তাদের চাকে মধু জমাতে শুরু করে, ঠিক তখনই একদল অসাধু মৌয়াল নির্ধারিত সময়ের আগেই হানা দিচ্ছে বনের গভীরে। সাধারণত প্রতি বছর ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক মৌসুম শুরু হয়, কিন্তু এবার তার অনেক আগেই মাছ ধরার পারমিট নিয়ে বনে ঢুকে অপরিপক্ব চাক কেটে ফেলছে কিছু অসাধু চক্র। এই অপরিপক্ব চাক কাটার ফলে মধুর উৎপাদন যেমন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি মৌমাছির ডিম ও লার্ভা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বনের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া এবং জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। স্থানীয় পেশাদার মৌয়ালরা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব চুরির ভিডিও প্রকাশ পেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ বনজীবীদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে।
এই আগাম মধু সংগ্রহের পেছনে কাজ করছে সাধারণ মানুষের কাছে সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধুর ব্যাপক চাহিদা এবং চড়া দাম। অসাধু চক্রটি লোকালয়ে এনে এসব মধু ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছে, যা মূলত সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের আশেপাশে গোপনে লেনদেন হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক মৌয়াল স্বীকার করেছেন যে, বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা মাছের পাশ নিয়ে বনে ঢুকে মধু সংগ্রহ করছেন। এর ফলে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে মৌসুমে বৈধভাবে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া সাধারণ মৌয়ালরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু পাচ্ছেন না। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বন বিভাগ থেকে সংগৃহীত মধুর পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ এই অবৈধ আহরণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের মধুর টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হলে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তারা ১ এপ্রিল থেকে পাশ দেওয়ার এবং চুরি ঠেকাতে কড়াকড়ির প্রতিশ্রুতি দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। পেশাদার মৌয়ালদের মতে, যদি এই অসময়ে চাক কাটা বন্ধ করা না যায়, তবে সুন্দরবনের মৌমাছি সম্পদ এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের স্বার্থে নিয়ম মেনে মধু আহরণ এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে প্রাকৃতিক এই সম্পদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে।
মন্তব্য করুন