ইউক্রেনের ক্রিভি রিহ শহরে অবস্থিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তালের মালিকানাধীন আর্সেলর মিত্তাল ইস্পাত কারখানায় এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রবিবার (১৬ আগস্ট) সংঘটিত এই হামলায় অন্তত দুইজন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিজ শহর ক্রিভি রিহের এই শিল্প কমপ্লেক্সটি দেশটির অন্যতম প্রধান ইস্পাত উৎপাদন কেন্দ্র। রুশ এই হামলায় কারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ব্লাস্ট ফার্নেসের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, এই হামলার ঠিক আগেই রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন ও ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, সারা দেশে অন্তত ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস বা প্রতিহত করা হয়েছে, যদিও এই পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ একে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মস্কো ও পোদলস্ক শহরে আবাসিক ভবন এবং বৃহৎ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামে ড্রোন আঘাত হানায় আগুন ধরে যায় এবং সেখানে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। পাশাপাশি রোস্তভ অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় পাঁচজন নিহত ও বেশ কিছু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেবল ক্রিভি রিহই নয়, বরং জাপোরিঝিয়া, সুমি ও দোনেৎস্ক অঞ্চলেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী কিয়েভেও রুশ হামলায় বেশ কয়েকটি স্থানে আগুন ধরে যায় এবং পোচাইনা মেট্রো স্টেশনের কাছে একটি বড় বইয়ের বাজারেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে রাশিয়া দেড় হাজারের বেশি ড্রোন, সমপরিমাণ গাইডেড বোমা এবং ৬২টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই ক্রমবর্ধমান হামলা মোকাবিলায় তিনি মিত্র দেশগুলোর কাছে অবিলম্বে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে, ক্রিভি রিহের ধাতব কারখানা এবং কিয়েভের সামরিক-শিল্প স্থাপনাগুলোই ছিল তাদের এই সুনির্দিষ্ট হামলার লক্ষ্য। মস্কোর ভাষ্যমতে, এসব লক্ষ্যের মধ্যে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত একটি কারখানাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। চলতি ২০২৬ সালে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইউক্রেনের এই কৌশলগত ড্র যুদ্ধের ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি সাধারণ রুশ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের এই ভয়াবহ রূপ এখন প্রতিবেশী ইউরোপীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। ঘটনার দিন রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি অজ্ঞাত ড্রোন স্পেনের বিমান বাহিনীর একটি এফ-১৮ যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর আকাশসীমায় এ ধরনের অনুপ্রবেশ যুদ্ধের পরিধি ইউরোপের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে, দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি ধ্বংসাত্মক হামলা উভয় দেশের শিল্প ও সামরিক অবকাঠামোকে যেমন পঙ্গু করে দিচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সংকটের শঙ্কাও তৈরি করছে।
মন্তব্য করুন