এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শতভাগ পাস ও জিপিএ-৫-এর ছড়াছড়ি দেখে নামি-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হলেও এর পেছনের অন্ধকার ও নির্মম চিত্র এখন ধীরে ধীরে সামনে আসছে। রাজধানীর কিছু খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত সব শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলাফল শতভাগ বা আকর্ষণীয় রাখার অনৈতিক প্রবণতার কারণে ঝরে পড়ছে শত শত শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ও ফরম পূরণকারী পরীক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার নরসিংদীর প্রখ্যাত নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং পাসের হার শতভাগ। এর আগেও ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানটিতে শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। কিন্তু এর পেছনের করুণ বাস্তবতা হলো, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠানটিতে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬১৬ জন, যার বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৩৮২ জন। অর্থাৎ, বিভিন্ন অজুহাতে ২৩৪ জন শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, টেস্ট বা নির্বাচনি পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। মূলত প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত শতভাগ জিপিএ-৫ ও পাসের গৌরব ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে একরকম শিক্ষার্থী বাছাই বা বাদ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মজার বিষয় হলো, টেস্টে বাদ পড়া এসব শিক্ষার্থীরা নরসিংদীর অন্য সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েও অত্যন্ত ভালো ফলাফল করেছে। যেমন নরসিংদী সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া ৫০ জনের মধ্যে ২৫ জন, ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ জনের মধ্যে ৩ জন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের ৪ জনের মধ্যে ১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫সহ কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেছে। একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর স্বনামধন্য মাইলস্টোন স্কুলেও। প্রতিষ্ঠানটির বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম মিলিয়ে ১৪৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও ডায়াবাড়ি ক্যাম্পাসে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ১ হাজার ৯৯১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে মাত্র ১ হাজার ৪৪০ জন; অর্থাৎ ৫৫১ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়নি। এছাড়া মোহাম্মদপুরের শাখা এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল, মনিপুর স্কুল ও মতিঝিল আইডিয়ালের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তুলনায় পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হওয়ার পেছনে এই কারসাজির অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, প্রথম দফার টেস্টে ফেল করা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অনুরোধে পুনর্বার পরীক্ষা নেওয়া হলেও অনেকেই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তবে মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলমকে ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি, যদিও প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে সঠিক তথ্য তার জানা নেই এবং শতভাগ পাস দেখানোর জন্য কাউকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের ফলাফল মূল্যায়নের সময় কেবল পাসের হার বা জিপিএ-৫ বিবেচনা না করে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা মিলিয়ে সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ করা উচিত, তবেই প্রকৃত মান বোঝা যাবে। নামি প্রতিষ্ঠানে ভালো ফলাফলের এই মোহ মূলত এক ধরনের বড় বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করছে। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা যায় না। অন্যদিকে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, শতভাগ পাস দেখানোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় যেসব প্রতিষ্ঠান জড়িত, তাদের তথ্য সংগ্রহ করে জবাবদিহিতা ও ব্যাখ্যা চাওয়া হবে এবং সন্তোষজনক জবাব না মিললে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন