চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র বাধাগ্রস্ত বা আটকাতে পারবে না বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টাইন ফেয়ার। শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি বিশেষ সেশনে শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সেশনে অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টাইন ফেয়ার বলেন, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বিশ্বপরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান রয়েছে। আঞ্চলিক প্রতিবেশী হিসেবে চীন ও ভারতের বাংলাদেশ নিয়ে যে গভীর মাত্রায় আগ্রহ ও সম্পৃক্ততা রয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক ততটা নেই; যার মূল কারণ হলো এসব দেশের নিজেদের মধ্যকার কৌশলগত ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বড় ধরনের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করার জন্য চীনের কাছে যে পরিমাণ মূলধন বা সম্পদ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামোর কাছে সেই তুলনামূলক সম্পদ নেই। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র কোনো প্রতিযোগিতা চলছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এই মার্কিন অধ্যাপক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, তিনি সেখানে কোনো প্রতিযোগিতাই দেখতে পাচ্ছেন না, বরং এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রকার হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতাই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ঢাকাকে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা বাধা দিতে পারবে কি না এমন সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কখনোই থামাতে পারবে না, কারণ বাংলাদেশ ঠিক সেটাই করবে যা তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের জন্য সবচেয়ে বেশি অনুকূল ও মঙ্গলজনক।
এদিকে ওই একই সম্মেলনে ‘মক্কা প্যাক্ট’ বা প্রস্তাবিত জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত মোস্তফা ওসমান তুরান তার সুনির্দিষ্ট মন্তব্যে জানান যে, মক্কা প্যাক্টের মতো উদ্যোগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোরালো আগ্রহ রয়েছে বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। তবে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ভূরাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কিংবা আঙ্কারা শেষ পর্যন্ত ঠিক কী ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত অবসরের কারণ দেখিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সাবেক এই তুর্কি রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি এখন আর তুরস্ক সরকারের কোনো পদে নেই এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হিসেবে এই মুহূর্তে তাদের ভবিষ্যৎ কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়ে কিছু বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে বাংলাদেশের তরফ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি ওয়াকিবহাল আছেন। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ ও গবেষকদের এসব আলোচনা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন