বিশিষ্ট পরিচালক রাজা সেনের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। ‘দেবীপক্ষ’, ‘খাঁচা’, ‘আত্মীয় স্বজন’, ‘চক্রব্যূহ’ এবং ‘মায়ামৃদঙ্গ’-এর মতো প্রশংসিত সব ছবির নির্মাতা রাজা সেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা স্মরণ করে মন খারাপের কথা জানিয়েছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণায় তিনি তুলে ধরেছেন এই গুণী নির্মাতার সঙ্গে কাটানো নানা মুহূর্ত ও ইন্ডাস্ট্রির কিছু অপ্রিয় সত্য।
রাজা সেনের কাজের ধরণ ছিল একেবারেই আলাদা। কোনো গল্প বা বার্তা জোর করে দর্শকের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং তার অন্তর্নিহিত অর্থ খুব সহজ ও স্বাভাবিকভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। তাঁর মধ্যে এক অদ্ভুত শৈল্পিক স্থিরতা ও নান্দনিক বোধ ছিল, যা বর্তমানের বাণিজ্যিক যুগে বিরল। তবে এত সফল কাজ ও একাধিক জাতীয় পুরস্কার পাওয়া সত্ত্বেও রাজা সেন উপযুক্ত সম্মান বা মূল্যায়ন পাননি বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন ঋতুপর্ণা। তাঁর মতে, বর্তমানের মতো টাকাপয়সা বা নিজেদের স্বার্থের পেছনে না ছুটে রাজা সেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা নিয়ে ছবি বানাতেন। অনেক ভালো প্রযোজকও তাঁর মতো পরিচ্ছন্ন ও গভীর সম্পর্কের গল্প নিয়ে ছবি তৈরির পথে সেভাবে এগিয়ে আসেননি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শেষ দিনগুলোতেও রাজা সেনের মাথায় কেবলই কাজ আর নতুন ভাবনা ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঋতুপর্ণা হাসপাতালে দেখতে গেলে তিনি উল্টো চিন্তায় পড়ে যেতেন এবং মাস্ক পরে সাবধানে থাকার কথা বলতেন। নতুন একটি দারুণ চিত্রনাট্য নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার কথা হচ্ছিল, আর তাঁর প্রবল ইচ্ছে ছিল সুস্থ হয়ে দ্রুত ফ্লোরে ফিরে আসার। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। অথচ ৭০ বছর বয়স এমন কোনো সময়ই নয়, যেখানে মানুষ হার মেনে নেবে। মায়ের মৃত্যুর পর মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙে পড়া এই মানুষটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চেয়েছেন, আরও অনেক সুন্দর কাজ উপহার দিতে চেয়েছেন।
বাংলা সিনেমার সোনালী অধ্যায়ের বহু স্মরণীয় কাস্টিং রাজা সেনের হাত ধরেই এসেছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুপ্রিয়া দেবী, শতাব্দী রায়, কোয়েল মল্লিক থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণা নিজে—সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে চমৎকার সব চরিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি। শুটিংয়ের সময় অ্যাক্সিডেন্টে মুখে আঘাত পাওয়ার পর পরিচালক নিজে যেভাবে পাশে থেকেছেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি এবং কোনো দিন রাগতে না দেখার স্মৃতি আজও অভিনেত্রীর মনে তাজা। সবশেষে ঋতুপর্ণা মনে করেন, রাজা সেনের রেখে যাওয়া এই সৃষ্টিশীল কাজ ও অমূল্য আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য সবসময় পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন