ভারতের রাজস্থান রাজ্যে চুরি যাওয়ার ভয় এবং অযথা খরচ ঠেকানোর এক অদ্ভুত ও বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের কষ্টার্জিত ৫ লাখ টাকা জমির মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন এক কৃষক। কিন্তু মর্মান্তিক বিষয় হলো, ঠিক কোন নির্দিষ্ট জায়গায় তিনি টাকাগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা তিনি পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ভুলে যান। দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর সেই টাকা মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ততক্ষণে আর কিছুই করার ছিল না, কারণ ক্ষুধার্ত উইপোকায় পুরো টাকার বান্ডেলগুলো কেটে ছিন্নভিন্ন ও নষ্ট করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলউদ্দীপক খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে। ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে নিজের মালিকানাধীন একটি জমি বিক্রি করে নগদ ৫ লাখ টাকা হাতে পেয়েছিলেন ওই ভারতীয় কৃষক। সেই টাকা দিয়ে পরবর্তীতে একটি সুন্দর বাড়ি নির্মাণের সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু ঘরে বা ক্যাশ বাক্সে টাকা জমা রাখলে তা চোর বা কোনো অসৎ মানুষের নজর পড়ে চুরি হয়ে যেতে পারে কিংবা নিজের বাজে অভ্যাসের কারণে টাকাগুলো অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ হয়ে যেতে পারে এমন নানাবিধ আশঙ্কা ও ভয়ের বশবর্তী হয়ে তিনি সম্পূর্ণ টাকা একটি পলিথিনের ব্যাগের ভেতরে অত্যন্ত যত্ন করে মুড়ে নিজের চাষের জমিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে রাখেন।
কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপানের তীব্র বদভ্যাস এবং মানসিক ভুলে যাওয়ার সমস্যার কারণে কৃষক লোকটি পরবর্তীতে ঠিক কোন নির্দিষ্ট স্থানে টাকাগুলো রেখেছিলেন, তার সঠিক স্মৃতি বা হদিশ আর মনে করতে পারেননি। বারবার নিজের মতো করে খোঁজ করেও লুকিয়ে রাখা সেই টাকার কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের স্ত্রী ও ছেলেদের সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। প্রথমে পরিবারের কেউই তার এই অবিশ্বাস্য কথাটি বিশ্বাস করতে রাজি হননি, কারণ জমি বিক্রি করার টাকা এভাবে কেউ মাটিতে পুঁতে রাখতে পারে তা তাদের কাছে অবাস্তব ঠেকেছিল। কিন্তু স্বামীর পীড়াপীড়িতে পরিবারের সদস্যরা মিলে পরবর্তীতে জমির বিভিন্ন সন্দেহভাজন অংশে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন। তবে বেশ কিছুদিন টানা চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরও প্রথম দফায় টাকার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি, ফলে বিষয়টি নিয়ে পরিবারের ভেতরে হতাশা তৈরি হয়। অবশেষে দীর্ঘ এক বছর পর বর্ষা মৌসুমে জমিতে নতুন করে চাষাবাদ করার জন্য যখন জমি প্রস্তুত ও কর্ষণ করা হচ্ছিল, ঠিক তখন হঠাৎ করেই মাটির নিচ থেকে সেই রহস্যময় পলিথিনের ব্যাগটি ওপরে উঠে আসে। তবে রাতের অন্ধকারে প্রথম দফায় বিষয়টি কারও চোখে সেভাবে ধরা পড়েনি।
পরের দিন সকালে যখন জমির ভেঙে যাওয়া বেড়া মেরামত করার কাজ চলছে, তখন কৃষকের স্ত্রী ও তার ছেলে মাটিতে পড়ে থাকা ওই পুরোনো পলিথিনের ব্যাগটি দেখতে পান। কৌতূহলবশত ব্যাগটি হাত দিয়ে খোলার সাথে সাথেই তাদের চোখ কপালে ওঠে এবং তারা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে যান। ব্যাগের ভেতরে ছিল ঠিক সেই ৫ লাখ টাকাই, যা তার স্বামী বা পিতা এক বছর আগে জমিতে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ততদিনে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মাটির আর্দ্রতা এবং উইপোকায় আক্রমণ করে সমস্ত নোটগুলো কুরে কুরে কেটে একেবারে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। নোটগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে সেগুলোর কোনো আর্থিক মূল্য অবশিষ্ট ছিল না। এই নষ্ট হয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোটগুলোর বিনিময়ে অন্তত আংশিক অর্থ বা আসল মূল্য উদ্ধার করা সম্ভব হয় কি না, সেই ক্ষীণ আশার ওপর ভরসা করে পরিবারের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত ও কাটা নোটগুলো সাবধানে সংগ্রহ করে স্থানীয় স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) একটি স্থানীয় শাখায় ছুটে যান। কিন্তু সাধারণ ব্যাংক কর্মীরা কাগজের মতো ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া ওই নোটগুলোর করুণ অবস্থা দেখেই তা পরিবর্তন বা গ্রহণ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে হাল না ছেড়ে তারা আরও উন্নত সেবার আশায় জেলার মূল এসবিআই প্রধান শাখায় গিয়েও একই বাধার মুখে পড়েন এবং সেখান থেকেও তাদের খালি হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে জমানো ৫ লাখ টাকা অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার সুদূরপরাহত আশা নিয়ে শুরু হওয়া এই দরিদ্র পরিবারের দীর্ঘ লড়াই ও চেষ্টা শেষ পর্যন্ত চরম হতাশা ও কান্নায় পর্যবসিত হয়।
মন্তব্য করুন