বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চরম অস্থির ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। সেই আন্দোলন দমনের পেছনের ভয়াবহ সব পরিকল্পনা ও নির্দেশনার চাঞ্চল্যকর তথ্য এবার প্রকাশ্যে এসেছে। আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীদের ঠিক কী ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তার কয়েকটি ফোনালাপের অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছে প্রসিকিউশন টিম। ওবায়দুল কাদেরসহ মোট আটজন আসামির বিরুদ্ধে চলা যুক্তিতর্ক শুনানির সময় এই অডিওগুলো ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়, যা মুহূর্তেই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উপস্থাপিত ফোনালাপগুলোতে মূলত আন্দোলনকারীদের কঠোর হাতে দমন করা, দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের জোরেশোরে জড়ো করা এবং রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পুরোপুরি ব্যবহার করে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার প্রমাণ রয়েছে। বিশেষ করে तत्कालीन আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি ফোনালাপে ওবায়দুল কাদের রাজধানীর কাঁটাবন, মৎস্য ভবন, পল্টন, নাইটিংগেল, বসিলা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আন্দোলনকারীদের জড়ো হওয়ার খবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানান।
এই খবর পাওয়ার পর শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের আরও আগ্রাসীভাবে মাঠে নামানোর কড়া নির্দেশ দেন। ফোনালাপে স্পষ্ট শোনা যায় যে, তিনি দলীয় লোকজনকে বড় জমায়েত করার তাগিদ দিচ্ছেন এবং আন্দোলনকারীদের যেখানেই বড় জমায়েত হবে, ঠিক সেখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিশ্চিত করার কথা বলছেন। একপর্যায়ে ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের জমায়েতের ঠিক আশপাশেই নিজেদের নেতাকর্মীদের জড়ো করার প্রস্তাব রাখলে, শেখ হাসিনা সরাসরি নির্দেশ দিয়ে বলেন যেন তাদের সেই জমায়েত ও কার্যক্রম পুলিশের পর্যাপ্ত সাপোর্ট পায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকারের চরম অবস্থানের প্রমাণ মিলছে ফোনালাপের পরবর্তী অংশে। শেখ হাসিনা কেবল পুলিশ বাহিনীকেই নয়, বরং র্যাব ও বিজিবিকেও কঠোরভাবে ব্যবহারের নির্দেশ দেন। আন্দোলনকারীদের বড় কোনো জমায়েত তৈরি হলে আকাশপথে হেলিকপ্টার থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কঠোর ও আক্রমণাত্মক নির্দেশনার কথাও তার কণ্ঠে শোনা যায়। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে আটকের প্রসঙ্গও এই ফোনালাপে উঠে আসে, যেখানে একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে অত্যন্ত নির্মমভাবে বলতে শোনা যায় যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে কয়টারে পার, উঠায়া নিয়া যাও।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির এই সময়ে প্রসিকিউশন এই অডিও রেকর্ডগুলোকে আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেওয়া পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও সরাসরি নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রমাণ হিসেবে দেখছে। ট্রাইব্যুনালে এসব ফোনালাপ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সেই উত্তাল দিনগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দমনপীড়নের বাস্তব চিত্র আরও একবার জাতির সামনে উন্মোচিত হলো, যা বিচার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন