আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'নেগোসিয়েশন' বা আলোচনা একটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়ানে সেই জটিল প্রক্রিয়াটি যেন এক জাদুকরি রূপ নিয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দুই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। সে সময় ট্রাম্প অত্যন্ত জোর দিয়ে দাবি করেছিলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। তবে বাস্তবে সেই দাবির বিন্দুমাত্র প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষণ বা যৌথ বিবৃতি না থাকলেও, গত দুই মাসে ট্রাম্প বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অন্তত ৩৭ বার দাবি করেছেন ইরান চুক্তি এই বুঝি হয়ে গেল!
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এই অনবরত ও অতি-আশাবাদী দাবির পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। সমালোচকদের দাবি, ট্রাম্প হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনাকে পুঁজি করে মার্কিন শেয়ার বাজারকে শান্ত রাখার মনস্তাত্ত্বিক চেষ্টা করছেন, কিংবা স্রেফ নিজের স্বভাবসুলভ ‘মুখের কথায়’ একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবে ঘটিয়ে ফেলতে চাইছেন। আবার বড় একটি পক্ষের মতে, ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচনি বৈতরণী পার হতেই ট্রাম্প এই অবাস্তব ‘চুক্তি তত্ত্ব’ ভোটারদের সামনে বারবার ফেরি করছেন। পরিস্থিতি যা-ই হোক, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের এই অবিরাম দাবিকে এখন আর কেউ খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে না।
ট্রাম্পের এই ‘চুক্তি সন্নিকটে’ নাটকের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৩ মার্চ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তার প্রধান প্রধান দাবির একটি টাইমলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
| তারিখ ও মাধ্যম | ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুনির্দিষ্ট দাবি ও বক্তব্য | বাস্তব চিত্র ও ইরানের প্রতিক্রিয়া |
২৩ মার্চ (এয়ার ফোর্স ওয়ান) | চুক্তির প্রধান প্রধান পয়েন্টগুলো, বলা যায় প্রায় সব পয়েন্টেই দুই পক্ষ একমত হয়েছে। | ইরান তখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার কথাই সরাসরি অস্বীকার করে। |
২৫-২৬ মার্চ (মন্ত্রিসভা বৈঠক) | ইরান খুবই বাজেভাবে চুক্তিটি করতে চাইছে। তারা চুক্তির জন্য কার্যত ভিক্ষা চাচ্ছে। | ইরান আড়াই মাস পার করলেও কোনো নতজানু নীতি দেখায়নি। |
৬-৭ এপ্রিল (সামাজিক মাধ্যম) | একটি ছোটখাটো ধাক্কা খাওয়ার আগে আমরা চুক্তির খুব কাছে ছিলাম। চূড়ান্ত করতে আর মাত্র দুই সপ্তাহ লাগবে। | এই ঘোষণার পরই দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতি দেওয়া হয়। |
১৬-১৭ এপ্রিল (ফক্স বিজনেস) | খুব ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইরান সবকিছুতেই রাজি হয়েছে, আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে চুক্তি হবে। | এপ্রিল শেষ হলেও কোনো চুক্তির খসড়া প্রকাশ পায়নি। |
১৮ মে (মিডিয়া ব্রিফিং) | মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অনুরোধে সামরিক হামলা ২-৩ দিন পিছাচ্ছি, কারণ তারা চুক্তির খুব কাছে পৌঁছে গেছে। | ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন যে তার আগের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী মেলেনি। |
৭ জুন (সংবাদমাধ্যম এক্সিওস) | আমরা ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। তবে ইরান-ইসরাইলের ‘সাইড যুদ্ধ’ এটি ঝুঁকিতে ফেলছে। | এক্সিওসকে দেওয়া এটি ছিল ট্রাম্পের তৃতীয় একই ধরনের বক্তব্য। |
৮ জুন (লিন্ডসে গ্রাহামের সভা) | আমরা এখন আলোচনা করছি; তারা খুব ভালো একটি চুক্তি করতে চায়। এমনকি তারা আমাদের সবকিছু দিয়ে দিতেও প্রস্তুত! | নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের শেষ ‘ভবিষ্যদ্বাণী’। |
গত মে ও জুনের শুরুতে ট্রাম্পের এই অবিরত দাবি থামেনি। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প কূটনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন। তবে ট্রাম্প দমে যাওয়ার পাত্র নন। সর্বশেষ গত সোমবার (৮ জুন) সাউথ ক্যারোলাইনার যুদ্ধবাজ ও কট্টরপন্থী সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের এক নির্বাচনি জনসভায় ট্রাম্প আবারও আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ‘চূড়ান্ত বিজয়ের’ ও ইরানের আত্মসমর্পণের ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান কখনোই ওয়াশিংটনের কাছে 'সবকিছু দিয়ে দেওয়া'র মতো আত্মঘাতী চুক্তিতে সই করবে না, বিশেষ করে যেখানে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সার্বভৌমত্ব জড়িত। ফলে, ট্রাম্পের এই ‘আগামী দুই সপ্তাহ’-এর ফাঁকা বুলি যে শুধুই মার্কিন ভোটারদের বিভ্রান্ত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের একচ্ছত্র কৃতিত্ব জাহির করার নির্বাচনি কৌশল, তা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
মন্তব্য করুন