রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরখান এলাকায় পৃথক দুটি গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ছয়জন গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। শনিবার ভোরে ও সকালে ঘটা এই দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় দগ্ধদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মতে, দগ্ধদের শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং শরীরের উল্লেখযোগ্য অংশ পুড়ে যাওয়ায় সবার অবস্থাই কম-বেশি আশঙ্কাজনক। দুটি ঘটনার পরই স্থানীয় থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঘরের ভেতর জমে থাকা গ্যাস লাইনের ও সিলিন্ডারের লিকেজ থেকেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে।
প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকায়, যেখানে দেশলাই বা সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। এতে মো. মিরাজ, সুজন ও বিপ্লব নামের তিন যুবক গুরুতর দগ্ধ হন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে পুরো ঘরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল, যা বাসিন্দারা টের পাননি। ভোররাতে সিগারেট জ্বালানোর জন্য যেই মুহূর্তে দেশলাই কাঠি বা লাইটার দিয়ে আগুনের সূত্রপাত করা হয়, সাথে সাথে পুরো ঘরে আগুন ধরে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন মিরাজের শরীরের ১৫ শতাংশ, সুজনের ২৪ শতাংশ এবং বিপ্লবের ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর উত্তরখান এলাকায় ঘটে দ্বিতীয় মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি। সেখানে একটি বহুতল ভবনের রান্নাঘরে সিলিন্ডারের গ্যাস লিকেজ থেকে আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটে একই পরিবারের তিন সদস্য দগ্ধ হন। দগ্ধরা হলেন আলী হোসেন, তার স্ত্রী হাসনাহেনা এবং তাদের একমাত্র মেয়ে আঁখি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আলী হোসেনের শরীরের শতভাগ অর্থাৎ ১০০ শতাংশই পুড়ে গেছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এছাড়া তার স্ত্রী হাসনাহেনার শরীরের ৬০ শতাংশ এবং শিশু আঁখির শরীরের ১৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। আলী হোসেন ও হাসনাহেনার অপর সন্তান রাতুল হাসান তুষার জানান, চিকিৎসকরা তার বাবা-মায়ের বেঁচে থাকার আশা খুবই ক্ষীণ বলে জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনজনেই আইসিইউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
রাজধানীর এই দুটি পৃথক ঘটনা আবারও আবাসিক এলাকায় গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অসচেতনতা এবং লাইনের ত্রুটির ভয়াবহ চিত্রকে সামনে এনেছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে দুটি দুর্ঘটনাস্থল খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে। ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাতে ঘুমানোর আগে বা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় চুলার চাবি কিংবা সিলিন্ডারের রেগুলেটর সঠিকভাবে বন্ধ না করায় এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। বন্ধ ঘরে দীর্ঘক্ষণ গ্যাস জমে থাকার পর যেকোনো ধরনের সামান্য স্ফুলিঙ্গ বা আগুন পুরো ঘরকে এক নিমেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং গ্যাস লাইনের এই বিপজ্জনক লিকেজের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন