চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে কর্মরত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ৬ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণ কর্মবিরতি শুরু করেছেন। চমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে রোববার সকাল ৮টা থেকে এই কর্মবিরতি কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। একই দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিক্ষোভ সমাবেশ এবং মেডিকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালনেরও কথা রয়েছে। শনিবার রাত দেড়টার দিকে অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মো. ইরফানুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক জরুরি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই কঠোর কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়। ইন্টার্নদের এই আকস্মিক কর্মবিরতির ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের এই শীর্ষস্থানীয় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা হাজার হাজার সাধারণ রোগীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসক নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ থেকে এফসিপিএস ট্রেনিং সংক্রান্ত কিছু নতুন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ওই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ঢাকা মেডিকেল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নতুন পদায়ন বন্ধ করা, চিকিৎসকদের জন্য উপজেলা পর্যায়ে দুই বছরের বাধ্যতামূলক সেবাদান এবং মেধাভিত্তিক অত্যন্ত সীমিত ভাতার বিধান রাখা হয়েছে, যার আওতায় মাত্র ১ হাজার জন ট্রেইনি এই সুবিধা পাবেন। আন্দোলনরত চিকিৎসকদের স্পষ্ট দাবি, নীতি নির্ধারকদের এই সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ অন্যায্য, বৈষম্যমূলক এবং দেশের বাস্তবতাবিবর্জিত। এই অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে গত বৃহস্পতিবার থেকেই মেডিকেল অঙ্গনে তীব্র আন্দোলন চলে আসছিল।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উত্থাপিত ৬ দফা দাবির মধ্যে প্রধানতম হলো, গত ১৯ মে জারি করা এফসিপিএস প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা। এর পাশাপাশি কর্মস্থলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তার কঠোর বাস্তবায়ন করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বর্তমান মাসিক ভাতা বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা, বেসরকারি ট্রেইনি চিকিৎসকদের ভাতা ৯ম গ্রেডের সমমান করা এবং বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য একটি সম্মানজনক পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়নের দাবিও তাদের সনদে রয়েছে। এ ছাড়া বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৪ বছর করা, বিএমডিসি আইনকে অধ্যাদেশের পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করা, ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা ফি সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার মধ্যে রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
আন্দোলনরত ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, তাদের উত্থাপিত ছয়টি যৌক্তিক দাবির মধ্যে কেবল প্রথম দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও বাকি মৌলিক দাবিগুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাকিব হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, তারা আলটিমেটাম দিয়ে প্রশাসনকে শুরুতে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরে আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দিলেও কোনো সমাধান আসেনি। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই তারা রোগীদের কষ্টের কথা জেনেও বাধ্য হয়ে এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই টানা কর্মবিরতি ও আন্দোলন রাজপথে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যার ফলে চমেক হাসপাতালের জরুরি ও ইনডোর সেবা সচল রাখা এখন হাসপাতাল প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন