পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-র জন্য বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্তে ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিলেন. কিন্তু সেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু করতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলায় কৃষকদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছে রাজ্য প্রশাসন. এই জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে প্রশাসন কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং কেন এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত—তা নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস’ (এপিডিআর)-এর মুর্শিদাবাদ শাখা. সংস্থাটির জেলা কমিটির সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী এই প্রতিবেদনটি চিঠির আকারে মুর্শিদাবাদের জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছেন.
এপিডিআরের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ির মাঠ পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের করুণ ও ক্ষুব্ধ পরিস্থিতির কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন. ভুতগাড়ির মাঠে প্রায় ১৫ হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি রয়েছে, যা সরকারি খাতায় নথিভুক্ত এবং যথেষ্ট উর্বরা. এই জমিতে মূলত পাট, গম, কলাই, মুসুরি, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন সবজির চাষ হয়. এই মাঠের ওপর এলাকার পাঁচটি গ্রামের (দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর এবং উত্তর ঘোষপাড়া) প্রায় ৬০০ পরিবারের ৩ হাজার মানুষ নির্ভরশীল. পরিবার পিছু জমির পরিমাণ মাত্র এক, দেড় বা দুই বিঘা হওয়ায় তারা মূলত ক্ষুদ্র কৃষক. জলঙ্গী নদীর ব্যাপক ভাঙনে আগের অনেক উর্বর জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা বাপ-ঠাকুরদার আমলের এই শেষ সম্বলটুকু কোনোভাবেই হারাতে চান না. তাঁরা ক্ষতিপূরণের সামান্য অর্থ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, এই টাকা কিছুদিনেই শেষ হয়ে যাবে কিন্তু জমি তাদের বছরের পর বছর খাবার জোগায়.
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলে বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা লাগিয়ে জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে কৃষকেরা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করেন. ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কৃষক অবস্থান নিলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়. জলঙ্গি থানার police ও বিএসএফ একসঙ্গে এসে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে চাইলে কৃষকদের সঙ্গে তীব্র বচসা বেঁধে যায়. শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন. কৃষকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিএসএফ চাষের জমি ছেড়ে অন্য কোথাও শিবির বানালে তাদের কোনো আপত্তি নেই.
ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলের জমিতে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে চাষাবাদ করেন. পাশের হিন্দু গ্রামের কৃষকেরাও এই জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছেন. এপিডিআরের সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গত সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়েই তাঁরা রাজ্যে নতুন সরকার এনেছেন. অথচ নতুন সরকার আসার পর যেভাবে সীমান্ত এলাকার চাষিদের জমি বিএসএফকে দিয়ে দখলের চেষ্টা চলছে, তা তাঁরা কিছুতেই মেনে নেবেন না এবং জমি রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন. গত দুই বছরে বিএসএফ দুবার জমির মাপজোখ করলেও কৃষকদের প্রতিরোধের কারণে তা সফল হয়নি.
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর তাদের পর্যবেক্ষণে রাজ্য সরকারের এই জমি অধিগ্রহণের চেষ্টাকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়েছে. পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কৃষকদের অসম্মতিতে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ বেআইনি. বিএসএফ ও পুলিশ যৌথভাবে যেভাবে প্রতিবাদী কৃষকদের সন্ত্রস্ত করছে, তা চরম অন্যায়. সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদ থামাতে কৃষকদের ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে. সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির আসল উদ্দেশ্য হলো মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় ‘হোল্ডিং’ বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (আটক কেন্দ্র) নির্মাণ করা. কৃষকেরা যাতে এর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে না পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে.
মানবাধিকার সংগঠনটি মুর্শিদাবাদের জেলা শাসকের কাছে বেশ কিছু জোরালো দাবি উত্থাপন করেছে. তারা জানিয়েছে, কৃষকদের অসম্মতিতে কোনোভাবেই জলঙ্গীর এই তিন ফসলি জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না. সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ইতিমধ্যে মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেশ কিছু মানুষকে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, যা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং এ পর্যন্ত পাঠানো সব মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে. কেবল দেশের আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হলেই কাউকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানো যাবে, তার আগে অনুপ্রবেশকারী বলে সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করা বন্ধ করতে হবে. একই সাথে, মুর্শিদাবাদে তৈরি সব ‘আটক কেন্দ্র’ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং হোল্ডিং সেন্টারে আটক থাকা নাগরিকদের তথ্য জনসমক্ষে এনে মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমকে তাদের সাথে দেখা করার অনুমতি দিতে হবে.
মন্তব্য করুন