ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন ও ন্যাটো সম্মেলনে সক্রিয় ভূমিকার ফলে তুরস্কের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এখন নতুন উচ্চতায়। তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা এই পরিবর্তিত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন।
ওয়াশিংটনের এই ইতিবাচক মনোভাব স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে ফেলেছে ইসরাইলকে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা তুরস্কের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক আক্রমণ জোরালো করলেও, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে তার তেমন কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে একজন দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি ন্যাটো সম্মেলনে এরদোয়ানের আমন্ত্রণের কারণেই তিনি যোগ দিচ্ছেন বলে উল্লেখ করেছেন, যা এরদোয়ানের প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
অথচ গত এক দশকে তুরস্কের জন্য পথটি মসৃণ ছিল না। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মিত্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তুরস্ক কূটনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল বদলে এরদোয়ান তার পররাষ্ট্রনীতিতে নিয়ে আসেন ভারসাম্য। মিসর, সৌদি আরব ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তুরস্ক আবারও নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর দেশ হিসেবে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্ব ইউরোপের কাছেও অনেক বেড়ে গেছে।
বিপরীত দিকে, গাজা যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়েছে। ইরান যুদ্ধ পরবর্তী বিভিন্ন কূটনৈতিক আলোচনা ও শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসরাইলের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়েছে। এমনকি প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনও কাটেনি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে তুরস্ক এখন মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘স্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী’ অংশীদার, যেখানে ইসরাইলকে অনেক ক্ষেত্রে উত্তেজনার উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অবশ্যই সব বিষয়ে তুরস্ক নিরঙ্কুশ সুবিধা পাচ্ছে এমনটি নয়; গাজা যুদ্ধবিরতি বা পরবর্তী শান্তিরক্ষা মিশনে তুরস্কের ভূমিকা এখনো সীমিত। তবে আনুষ্ঠানিক উত্তেজনা ও কঠোর শব্দ ব্যবহারের আড়ালে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে গোয়েন্দা সমন্বয় ও সিরিয়া সীমান্ত নিয়ে নিরাপত্তা যোগাযোগ এখনো চালু রয়েছে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি স্পষ্ট যে, তুরস্ক তার হারানো কূটনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে তারা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী।
মন্তব্য করুন