চব্বিশের ৪ আগস্ট স্বৈরাচারবিরোধী একদফা আন্দোলনের সময় উত্তাল ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলায় সাতজন নিহত হওয়ার ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পরও বিচার ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা ও শহীদ পরিবারগুলো।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। দুপুরের দিকে ট্রাংক রোডের দিক থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা মহিপালের দিকে এগিয়ে এসে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও দুজনসহ মোট সাতজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, মো. মাহবুবুল হাসান, মো. সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাইদুল ইসলাম, জাকির হোসেন এবং অটোরিকশাচালক মো. সবুজ। এ ছাড়া ওই আন্দোলনে অংশ নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আরও চার ফেনীবাসী প্রাণ হারান।
এই ঘটনায় ফেনী সদর মডেল থানায় সাতটি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টাসহ মোট ২২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২ হাজার ১৯৯ জনকে এজাহারভুক্ত এবং প্রায় ৪ হাজার জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ পর্যন্ত সহস্রাধিক আসামিকে গ্রেফতার করলেও, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া অস্ত্রধারীদের অনেকেই এখনো পলাতক রয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি অনুযায়ী সেদিনের ঘটনায় অন্তত ৩০ জনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেলেও নূর নবী মেম্বার ও যুবলীগ নেতা সম্রাট ছাড়া বাকি প্রধান অস্ত্রধারীরা ধরা পড়েননি এবং তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফেনীর সাবেক জেলা সমন্বয়ক ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মুহাইমিন তাজিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সেদিনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেকেই এখনো এলাকায় বা দেশেই অবস্থান করে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন, যা প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা। তিনি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সব হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
এদিকে ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফৌজুল আজিম জানান, অস্ত্রধারীদের অনেকের পরিচয় চিহ্নিত করা হয়েছে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। অন্যদিকে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানিয়েছেন, হত্যা ও সহিংসতার মামলাগুলোর তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে চলেছে। প্রায় আড়াই হাজার আসামির মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি গ্রেফতার হয়েছেন এবং পলাতক অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য করুন