যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এসিআই মর্টার ওয়ার্কবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চুয়েটের 'টিম চুয়েট সি'। আইইউটির দলও অর্জন করেছে দুটি ক্যাটাগরিতে পদক।
যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার জন্য এলো এক অনন্য ও ঐতিহাসিক গৌরবময় সাফল্য। দেশটির জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত অত্যন্ত সম্মানজনক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘এসিআই মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬’-এ বিশ্বের নামীদামি সব বিশ্ববিদ্যালয়কে পেছনে ফেলে সামগ্রিক বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দল ‘টিম চুয়েট সি’। শুধু প্রথম স্থানই নয়, পাশাপাশি প্রতিযোগিতার অর্থনৈতিক বিভাগে দ্বিতীয় স্থানও নিজেদের দখলে নিয়েছে তরুণ শিক্ষার্থীদের এই দলটি।
একই আন্তর্জাতিক আসরে প্রশংসনীয় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশের অপর খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি)। তাঁদের প্রতিনিধি দল পরিবেশগত নকশা বিভাগ এবং ‘এস্থেটিকস ইন কংক্রিট’,এই দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। ফলে দুই দল মিলিয়ে মোট চারটি বৈশ্বিক পুরস্কার দেশে এনে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে উঁচুতে তুলে ধরেছেন এই উদীয়মান প্রকৌশলীরা।
কংক্রিট নির্মাণ, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও কোড প্রণয়নকারী বিশ্বের শীর্ষ সংস্থা ‘আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট’ (এসিআই) প্রতি বছর এই আন্তর্জাতিক মেধা লড়াইয়ের আয়োজন করে। গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এবারের আসরে আন্তর্জাতিক বিচারকদের কঠোর যাচাই-বাছাই ও বিশ্বজুড়ে জমা পড়া গবেষণাপত্র মূল্যায়ন শেষে চূড়ান্ত পর্বের জন্য মাত্র ৪০টি দলকে মনোনীত করা হয়। চূড়ান্ত পর্বে বাস্তবিক প্রয়োগ ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার চমৎকার প্রদর্শন ঘটিয়ে শীর্ষস্থান ছিনিয়ে নেয় চুয়েট।
বিজয়ী ‘টিম চুয়েট সি’ দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন খন্দকার ফাহাদ আলম, স্বরূপ চন্দ্র মোদক, তানজিম মুশাররাত তুশিন ও সুমাইয়া বিনতে মান্নান। দলটির ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজর ও পরামর্শক ছিলেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার-চুয়েটের অনুষদ উপদেষ্টা ড. জি এম সাদিকুল ইসলাম। অপরদিকে আইইউটির বিজয়ী দলের সদস্যরা হলেন আরিনা তাহরিনা আমিন, রাজিত মুহাম্মদ চৌধুরী, জাসিয়া জুবায়ের, লামিয়া তাসসুম, রাগীব শাহরিয়ার, মো. হুমায়েদ তাহসিন হক, মো. মাহাদী হাসান নিলয় ও মো. জুবায়ের আনজুম। এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি অধ্যাপক ড. তারেক উদ্দিন আইইউটি দলের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়া মর্টারের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত গুণাবলী চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। মূল্যায়নের ৫০ শতাংশ নম্বর নির্ধারিত ছিল মর্টারের প্রবাহক্ষমতার ওপর এবং ২০ শতাংশ ছিল কার্যকারিতা ও স্থিতিশীলতার ওপর। এছাড়া পরিবেশবান্ধব উপাদানের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর ১০ শতাংশ, অর্থনৈতিক সাশ্রয়িতার ওপর ৫ শতাংশ এবং প্রযুক্তিগত রিপোর্টের উৎকর্ষতার ওপর বাকি ১৫ শতাংশ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সকল ক্ষেত্রে ধারাবাহিক পারফর্ম করে সেরা নির্বাচিত হয় চুয়েটের প্রজেক্টটি।
আন্তর্জাতিক এই অর্জন সম্পর্কে চ্যাম্পিয়ন দলের অন্যতম সদস্য স্বরূপ চন্দ্র মোদক অনুভূতি ব্যক্ত করে জানান, বৈশ্বিক মঞ্চে বিশ্বের প্রখ্যাত সব প্রতিষ্ঠানের সাথে লড়াই করে মেধার প্রমাণ দিতে পেরে তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য নতুন করে উপলব্ধি করেছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের যেকোনো প্রতিযোগিতায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
দলটির উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জি এম সাদিকুল ইসলাম অত্যন্ত আবেগপ্লুত হয়ে জানান, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে চুয়েটের শিক্ষার্থীরা অনলাইনভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বহুবার পুরস্কৃত হলেও সশরীরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরাসরি ল্যাবে কাজ করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন তাঁদের বহুদিনের ছিল। মালয়েশিয়ায় বিগত আসরে চতুর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তরুণ প্রকৌশলীরা এবার বিশ্বসেরার মুকুট অর্জন করেছে, যা পুরো দেশের শিক্ষা ও প্রকৌশল খাতের জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।
মন্তব্য করুন