বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়, সে সম্পর্কে অনুচ্ছেদ ১৫২-এ স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া রয়েছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, সেখানে রাষ্ট্র হিসেবে জাতীয় সংসদ, সরকার এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কথা উল্লেখ থাকলেও বিচার বিভাগকে পুরোপুরি বাদ রাখা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সাধারণত তিনটি মৌলিক স্তম্ভ—আইনসভা, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। অথচ আমাদের সংবিধানের এই সংজ্ঞাটিতে বিচার বিভাগের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত নীরবতা ও অসম্পূর্ণতা তৈরি করে রেখেছে।
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নকারীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা পৃথক্করণের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, রাষ্ট্র বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখবে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়েও বিচার বিভাগীয় চাকরিকে সাধারণ সরকারি চাকরি থেকে আলাদা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবুও অনুচ্ছেদ ১৫২-এর সংজ্ঞায় বিচার বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত না করায় প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতায় এক ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। যার ফলে আদালতকে প্রায়শই সরকারের সমান অংশীদার হিসেবে না দেখে কেবল প্রয়োজনমতো ব্যবহারের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা যায়।
সম্প্রতি রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের যে জোর আলোচনা চলছে, সেখানে এই সুদীর্ঘ দিনের ঐতিহাসিক ফাঁকটি বন্ধ করার একটি উপযুক্ত সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৫২-এ রাষ্ট্র সংজ্ঞায় বিচার বিভাগকে যুক্ত করা হলে নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হবে না, কিংবা ‘রাষ্ট্র বনাম অমুক’ জাতীয় মামলায় বিচারকদের পক্ষভুক্ত হওয়ারও সুযোগ নেই। বরং এই একটি মাত্র শব্দ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে কেবল সরকারের অনুগ্রহ হিসেবে দেখার সুযোগ বন্ধ হবে এবং সংবিধান স্বীকৃত তিনটি মৌলিক বিভাগের সমান অংশীদারত্ব পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মন্তব্য করুন