আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানি সমাজের ভেতরে এক অভূতপূর্ব ও বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং কট্টরপন্থীরা গভীর শোক প্রকাশ করে ৪০ দিনের শোক পালনের ডাক দিয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। তেহরানের কিছু আবাসিক এলাকা এবং দেশটির অন্যান্য বড় শহরের অলিগলিতে অনেক সাধারণ মানুষকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বা ছাদে উঠে গান বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এই স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস নির্দেশ করছে যে, গত কয়েক বছরের কঠোর শাসন এবং সামাজিক বিধিনিষেধের চাপে পিষ্ট জনগণের একটি বড় অংশ এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
রাতের আঁধারে অনেক জায়গায় আতশবাজি ফোটানোর খবরও পাওয়া গেছে, যা প্রথাগত শোকের আবহের ঠিক উল্টো। খামেনির দীর্ঘ শাসনামলে যারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারিয়েছিলেন কিংবা অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ছিলেন, তাদের মধ্যে এই মৃত্যু এক ধরণের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ, যারা সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল, তারা এই মুহূর্তটিকে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। যদিও আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তবুও সাধারণ মানুষের এই নির্ভীক উল্লাস ইরানি শাসনের অভ্যন্তরীণ ফাটলকেই যেন বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করে তুলছে।
তবে এই আনন্দের বিপরীতে এক ধরণের চাপা আতঙ্কও বিরাজ করছে। উল্লাস প্রকাশকারী নাগরিকদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, নিরাপত্তা বাহিনী এই ধরণের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর দমনপীড়ন চালাতে পারে। তবুও, দীর্ঘদিনের ভয়ের দেয়াল ভেঙে যেভাবে গানের সুরে মানুষ রাজপথ বা বারান্দায় নেমে এসেছে, তা ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল অধ্যায় হয়ে থাকবে। এক নেতার বিদায়ে যখন এক পক্ষ যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে, তখন অন্য পক্ষের এই গান আর উল্লাস প্রমাণ করে যে, একটি দেশের সীমানার ভেতরেই বাস করে দুটি ভিন্ন মেরুর আদর্শ এবং আগামীর স্বপ্নের লড়াই।
মন্তব্য করুন