মিয়ানমারে জান্তা সরকারের জোরপূর্বক সামরিক নিয়োগ নীতি এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের কৌশলগত সহায়তা দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। ২০২১ সালে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে এতদিন যে প্রতিরোধ যোদ্ধারা (বিদ্রোহী) আক্রমণাত্মক অবস্থানে ছিল, তারা এখন মূলত রক্ষণাত্মক নীতি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। জান্তার নতুন সব যুদ্ধকৌশলের মুখে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহীরা এখন অনেকটাই কোণঠাসা।
বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জান্তা বাহিনীর জোরপূর্বক সেনা সংগ্রহের নির্মম চিত্র। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া শেফ, গভীর রাতে কারাওকে সেশন থেকে ফেরার পথে আটক তরুণ কিংবা জুতার ভেতর জোর করে মাদক ঢুকিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁ্সানো বেসামরিক ব্যক্তিদের চার মাসের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দিচ্ছে জান্তা। এই অনিচ্ছুক তরুণদের দিয়ে ফ্রন্ট লাইনে ঢাল হিসেবে কাজ করানো হচ্ছে। এদেরই কয়েকজন কারেন রাজ্যের জান্তা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) কাছে আশ্রয় নিয়েছেন, যাদের শেষ পর্যন্ত থাইল্যান্ড সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
পিডিএফ কমান্ডারদের একাংশ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিদ্রোহীদের পিছিয়ে পড়ার ৪টি মূল কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. বাধ্যতামূলক সামরিক আইন: ২০২৪ সাল থেকে জান্তার জারি করা বাধ্যতামূলক সামরিক আইনের কারণে তারা এখন ফ্রন্ট লাইনে সীমাহীন জনবল (ম্যানপাওয়ার) পাচ্ছে, যা বিদ্রোহীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২. তহবিল ও গোলাবারুদের তীব্র সংকট: প্রযুক্তিগত বা বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা থাকলেও প্রতিরোধের জন্য বিদ্রোহীদের সম্পদ খুবই সীমিত। তহবিলের অভাবে তারা ইচ্ছামতো অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বা গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারছে না।
৩. রাশিয়ার বিমান শক্তি ও ড্রোন প্রযুক্তি: রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করার পর জান্তা বাহিনীর বিমান শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। এখন জোড়ায় জোড়ায় বিমান হামলার পাশাপাশি ড্রোন প্রযুক্তিতেও জান্তা বিদ্রোহীদের চেয়ে সংখ্যা ও মানে এগিয়ে রয়েছে।
৪. চীনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি: কারেন ও কাচিন রাজ্যে খনিজ সম্পদে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা চীন বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তার যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অস্ত্রের সরবরাহ চেইন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর কান্নাকাটির মধ্যেই জঙ্গলের ভেতরের এক ফিল্ড হাসপাতালে জন্ম নিয়েছে এক নবজাতক কন্যা শিশু। ২৪ বছর বয়সি বিদ্রোহী যোদ্ধা ইন চিত এবং তার স্ত্রী মে কিউট মন তাঁদের এই সন্তানের নাম রেখেছেন ‘সু পেয়ে’, যার অর্থ 'পূরণ হওয়া ইচ্ছা'। জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিজেদের গ্রাম হওয়ায় এখনই মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন না এই দম্পতি। তবে বুকভরা আশা নিয়ে ইন চিত বলেন, "বিপ্লব শেষ হয়ে যখন শান্তিময় সময় ফিরবে, একটি মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে আমরা মেয়েকে নিয়ে পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করতে যাব।"
মন্তব্য করুন