পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দেশের প্রচলিত বন্যপ্রাণী আইনের কঠোর প্রয়োগের এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়েছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়া সীমান্ত সংলগ্ন কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী পাচারের অভিযোগে আটক এক যুবককে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে উদ্ধার হওয়া বিরল প্রজাতির একটি মুখপোড়া হনুমান ও ১২টি কচ্ছপকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা শেষে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ।
মঙ্গলবার (৯ জুন) চকরিয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. ফরহান সাদিক এই রায় প্রদান করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত যুবকের নাম মো. হাদিস রহমান, তিনি ঢাকা জেলার মিরপুর-১১ এলাকার বাসিন্দা সুলতান মিয়ার ছেলে। এর আগে সোমবার (৮ জুন) বিকেলে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের চুনতি রেঞ্জের একটি বিশেষ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চকরিয়া পৌরসভার ভাঙ্গারমুখ এলাকার একটি বাড়িতে হানা দিয়ে পাচারের জন্য খাঁচাবন্দি করে রাখা প্রাণীগুলো উদ্ধার করে এবং হাদিস রহমানকে হাতেনাতে আটক করে।
বন বিভাগের এই সফল অভিযান এবং বিপন্ন বন্যপ্রাণীগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিচে তুলে ধরা হলো:
বিপন্ন মুখপোড়া হনুমান উদ্ধার: চুনতি অভয়ারণ্য রেঞ্জের বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান শেখ জানান, উদ্ধার হওয়া মুখপোড়া হনুমানটি (Phayre's Leaf Monkey) বাংলাদেশের অত্যন্ত বিরল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিপন্ন প্রজাতির একটি বন্যপ্রাণী। এগুলো বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কচ্ছপ পাচার রোধ: মুখপোড়া হনুমানটির পাশাপাশি ওই বাড়ি থেকে আরও ১২টি দেশীয় কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়, যা মূলত মাংস ও আন্তর্জাতিক চোরাচালানের উদ্দেশ্যে বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে অবমুক্তকরণ: উদ্ধারকৃত প্রাণীগুলোকে বর্তমানে বন বিভাগের কঠোর তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। পশু চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে প্রাণীগুলোকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় অবস্থিত ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যপ্রাণীগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তর করা হচ্ছিল। এই অপরাধের প্রেক্ষিতে ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২’-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের পর আটক ব্যক্তিকে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ বিচারক আসামির অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
এই রায়ের পর বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূরজাহান বেগম বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "কোথাও বন্যপ্রাণী শিকার, খাঁচায় বন্দি করে রাখা, কেনাবেচা বা পাচারের ঘটনা নজরে এলে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দ্রুত বন বিভাগ কিংবা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করুন।" বন্যপ্রাণী পাচারকারী সিন্ডিকেটের রুটগুলো ধ্বংস করতে চুনতি অভয়ারণ্যসহ সারা দেশে বন বিভাগের এই ঝটিকা ও নিয়মিত অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
মন্তব্য করুন