রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জড়িত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামের দুই যুবককে অবশেষে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া কিছু সাধারণ আলামত—যেমন খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা, পোড়ানো চুরি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই দুই ঘাতককে সফলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বিশেষ করে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে, যা মামলার তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান যে অপরাধীরা অপরাধ সংঘটিত করার পর ওই বাসাতেই বসে ইয়াবা সেবন করেছিল এবং সেখান থেকেই তদন্তের প্রধান সূত্রটি হাতে পায় পুলিশ। পুলিশ কমিশনার বলেন, খুনিরা ঘটনার সময় বা পরে অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায় এবং সেই অর্ধ কামড়ানো শসার সাথে আসামিদের জবানবন্দি হুবহু মিলে গেছে। এর পাশাপাশি তারা বাড়ি থেকে একটি চুরি সংগ্রহ করে সেটি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে যে সেটি আসল সোনা কি না। এই বিশেষ আচরণটি থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কোনো ব্যক্তি সরাসরি জড়িত রয়েছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত দুই আসামি সম্পর্কে পরস্পরের মামাতো ভাই এবং তারা নিহত শিক্ষক পরিবারের খুব কাছের প্রতিবেশী ছিলেন। তাদের একজনের বাবা কানুদাস এবং অন্যজনের বাবা বিনয়চন্দ্র দাস। নিহত গণপতি চক্রবর্তী অত্যন্ত সম্মানিত একজন ব্যক্তি ছিলেন এবং আসামিদের সাথে তাদের কোনো ধরনের বিরোধ বা শত্রুতা ছিল না। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে দুই মামাতো ভাই পাশের একটি ভবনের ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর ছাদে প্রবেশ করে মাদক সেবন করছিল। টের পেয়ে শিক্ষক গণপতি খালি গায়ে কাঁধে গামছা নিয়ে ছাদে গিয়ে তাদের উপস্থিতি সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করলে খুনিরা নিজেদের পরিচয় ফাঁস হওয়ার ভয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরবর্তীতে একে একে পরিবারের বাকি সদস্যদেরও একইভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তদন্তে আরও জানা যায়, গ্রেফতারকৃত সিদ্ধার্থ পেশায় একজন স্বর্ণের দোকানের কারিগর। ঘটনার পর তারা পুরো ঘটনাটিকে একটি পেশাদার ডাকাতি হিসেবে সাজানোর জন্য ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে রাখে এবং লুট করা অলংকার আগুনে পুড়িয়ে যাচাই করে। এমনকি পুলিশ বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা হাতের ছাপের কোনো আলামত যেন না থাকে, সেজন্য তারা ঘরের দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানির বালতিতে ডুবিয়ে রাখে। ঘটনার পরপরই পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে এবং রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান ও দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে দুই আসামিকে পাকড়াও করে। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের জানান যে আলামত ও ডিএনএ টেস্টের চূড়ান্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রংপুর জিলা স্কুলের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), কারমাইকেল কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী কন্যা আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ১২ বছরের শিশু আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম। প্রবীণ এই শিক্ষকের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো রংপুর শহরজুড়ে গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য করুন