বাংলাদেশের বিপক্ষে টি২০ সিরিজের প্রথম ম্যাচের মধ্য দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন অলরাউন্ডার নিখিল চৌধুরী. ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার গত বুধবার (১৭ জুন) চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে স্বাগতিক বাংলাদেশের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক টি২০ ক্রিকেটে অভিষিক্ত হন. এর মাধ্যমে দীর্ঘ ছয় দশকের (৬০ বছর) ইতিহাস ভেঙে প্রথম ভারত-বংশোদ্ভূত পুরুষ ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে খেলার গৌরব অর্জন করলেন তিনি. ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তথ্যমতে, এর আগে গুরিন্দর সান্ধু বা তানভীর সাংঘার মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করলেও, সরাসরি ভারতে জন্মগ্রহণ করা কোনো পুরুষ ক্রিকেটার ১৯৬৪ সালের পর আর অজিদের মূল দলে সুযোগ পাননি. ১৯৬৪ সালে গুজরাটে জন্মগ্রহণকারী লেগ-স্পিনার রেক্স সেলার্স ভারতের কলকাতায় অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেষ টেস্ট খেলেছিলেন. ফলে নিখিলের এই অভিষেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত.
নিখিল চৌধুরীর এই ঐতিহাসিক যাত্রার শুরুটা হয়েছিল সম্পূর্ণ নাটকীয় এবং কাকতালীয়ভাবে. ২০২০ সালের মার্চ মাসে তিনি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে তাঁর চাচার বাড়িতে স্রেফ নিজের জন্মদিন উদযাপনের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন. মে মাসে ভারতে ফিরে আসার রিটার্ন টিকিটও তাঁর বুক করা ছিল. কিন্তু ঠিক সেই সময়েই বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর প্রকোপ শুরু হয় এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত সিল হয়ে যাওয়ায় তিনি অস্ট্রেলিয়াতেই আটকে পড়েন.
প্রথমে ছয় মাস এবং পরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আরও তিন মাস, অর্থাৎ প্রায় নয় মাস সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকার পর তিনি ব্রিসবেনের ‘নর্থস’ ক্লাবের হয়ে ক্লাব ক্রিকেট খেলা শুরু করেন. সেখানে তাঁর চমৎকার পারফরম্যান্স নজর কাড়ে স্থানীয় কোচ ও সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার জেমস হোপসের. হোপস তাঁর প্রতিভা দেখে বিগ ব্যাশ লীগের (বিবিএল) বেশ কয়েকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কাছে নিখিলের নাম সুপারিশ করেন. পরবর্তীতে নিয়ম অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় টানা তিন বছর অবস্থান ও স্থানীয় ক্রিকেটে খেলার শর্ত পূরণ করার পর ২০২৩ সালে তিনি বিগ ব্যাশ লীগের দল হোবার্ট হারিকেনসের সাথে পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন.
অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের আর্থিক জোগানের জন্য নিখিলকে মাঠের বাইরে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল. তিনি রেস্তোরাঁয় সবজি কাটার কাজ করেছেন, জীবিকার তাগিদে ট্যাক্সি চালিয়েছেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পার্সেল ডেলিভারি দেওয়ার কাজও করেছেন.
নিখিল জানান, এই কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোই আজ তাঁকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে মানসিক ও শারীরিকভাবে শান্ত থাকতে সাহায্য করেছে. ক্রিকেটের বাইরে জীবনের সবচেয়ে খারাপ ও কঠিন সময়গুলো দেখে আসায় এখন ক্রিকেট মাঠে তিনি কোনো বাড়তি মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা অনুভব করেন না. তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত চমৎকার, যেখানে প্রত্যেকেই কাজের পাশাপাশি নিজেদের ফিটনেস ও ট্রেনিং বজায় রাখে. তিনি নিজেও প্রতিদিন কাজে যাওয়ার আগে এবং কাজ থেকে ফিরে নিয়মিত কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যেতেন.
আসন্ন বাংলাদেশ সিরিজের আগে ব্রিসবেনের ক্যাম্পে নিখিল ডাক পাননি, কারণ তখনো তিনি মূল স্কোয়াডে ছিলেন না. কিন্তু অজি তারকা ব্যাটার ট্রাভিস হেড পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ব্যক্তিগত ছুটি নেওয়ায় কপাল খোলে নিখিলের. অজি নির্বাচক টনি ডোডেমাইড যখন নিখিলকে ফোন করে দলে নেওয়ার খবরটি জানান, তখন তিনি বেলজিয়ামে অবস্থান করছিলেন. ম্যাচের দিন তিনেক আগে চট্টগ্রামের মাঠে সৌম্য সরকারের একটি দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচ নেওয়ার পরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের যোগ্যতা নিয়ে নিখিলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়.
অতীতে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে পাঞ্জাবের হয়ে খেলার সময় যুবরাজ সিং বা হরভজন সিংয়ের মতো কিংবদন্তিদের সাথে খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় চট্টগ্রামের বিশাল ও চিৎকার করা উন্মাতাল দর্শক সামলানো তাঁর জন্য কঠিন ছিল না. বর্তমানে তিনি দলের সিনিয়র স্পিনার অ্যাডাম জাম্পার কাছ থেকে টি২০ ক্রিকেটের বোলিং কৌশল ও অভিজ্ঞতা শেখার ওপর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, যিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক টি২০ ক্রিকেটে ১৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন.
মন্তব্য করুন