মানুষের জীবনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হলো আল্লাহ তাআলার ওয়াদা। পৃথিবীর কোনো প্রতিশ্রুতি শতভাগ নিশ্চিত না হলেও মহান রবের প্রতিটি অঙ্গীকার সত্য, নির্ভুল এবং অব্যর্থ। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য এমন কিছু মহামূল্যবান ওয়াদা করেছেন, যা হৃদয়ে আশা জাগায়, বিপদে সাহস দেয় এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আলোর দিশা দেখায়। যে ব্যক্তি এই ওয়াদাগুলো বিশ্বাস করে, হৃদয়ে ধারণ করে এবং জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তার জীবন হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়, সফল ও বরকতময়।
কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর পাঁচটি মহান প্রতিশ্রুতি এবং এর থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
এটি এমন এক সম্মানের ঘোষণা, যা কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। বান্দা যখন তাসবিহ, তাহলিল, কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ ও ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন মহান রবও তাকে তার বিশেষ রহমত, সাহায্য ও অনুগ্রহের মাধ্যমে স্মরণ করেন। সুরা আল-বাকারার ১৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব’। হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সঙ্গে আচরণ করি, আর সে যখন আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সঙ্গে থাকি’।
দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও আল্লাহর দরজা খোলা থাকে। তিনি তার বান্দার কান্না, আকুতি ও মনের গোপন কথাও শুনেন। সুরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াতে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হলো, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘দোয়াই হলো ইবাদত’।
মানুষ সাধারণত যা নেই তা নিয়ে চিন্তা করে; অথচ ইসলাম শেখায় যা আছে তার জন্য শুকরিয়া আদায় করতে। কৃতজ্ঞতা শুধু সম্পদ নয়, বরং ইমান, স্বাস্থ্য, পরিবার, জ্ঞান ও শান্তির বরকতও বৃদ্ধি করে। সুরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব’। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়; এটি বিপদ দূর করে, অন্তরে প্রশান্তি আনে এবং রহমতের দরজা খুলে দেয়। সুরা আল-আনফালের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তারা যখন ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না’। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা। যে ব্যক্তি আল্লাহকে নিজের অভিভাবক বানায়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে অসহায় হয় না। সুরা আত-তালাকের ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর উপর প্রকৃত তাওয়াক্কুল করতে, তবে তিনি তোমাদেরকে এমনভাবে রিজিক দিতেন যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন’।
আল্লাহ তাআলার এই পাঁচটি ওয়াদা একজন মুমিনের জীবনের জন্য পাঁচটি অমূল্য দিকনির্দেশনা। আল্লাহকে স্মরণ করা, আন্তরিকভাবে দোয়া করা, সর্বদা শুকরিয়া আদায় করা, নিয়মিত ইস্তিগফার করা এবং প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহর উপর ভরসা রাখা— এই আমলগুলো শুধু আখিরাতের সফলতাই নয়, দুনিয়ার জীবনকেও শান্তি ও বরকতে ভরিয়ে দেয়। সুরা আল-ইমরানের ৯ নম্বর আয়াতে যেমনটি বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না’—তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে বিশ্বাসীর সবচেয়ে বড় শক্তি ও আশ্রয় হলো মহান আল্লাহর এই অব্যর্থ ওয়াদা।
মন্তব্য করুন