তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে চীন. অরুণাচল প্রদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিশাল প্রকল্পকে ঘিরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে. এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চীনের ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই 'মেডোগ হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্প' বর্তমানে নির্মাণাধীন. উজানে চীনের এই বিশাল বাঁধের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি ও পানিসংকট মোকাবিলায় এবার পাল্টা কৌশলগত পরিকল্পনা জোরদার করছে নয়াদিল্লি.
দুই দেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতিযোগিতা ও বর্তমান পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
চীনের ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার মেডোগ প্রকল্পের পালটা জবাব হিসেবে ভারত অরুণাচল প্রদেশের আপার সিয়াং ও সিয়াং জেলায় ১১ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ (এসইউএমপি) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এনএইচপিসি (NHPC) পরিচালিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ভারতের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র. এই প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি রুপি.
তবে দুই দেশের প্রকল্পের অগ্রগতিতে রয়েছে বড় ব্যবধান. চীনের মেডোগ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেলেও ভারতের এসইউএমপি প্রকল্পটি এখনো সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক প্রস্তুতির পর্যায়েই আটকে রয়েছে, যার নির্মাণ-পূর্ব কার্যক্রমও এখনো শুরু হয়নি.
ইয়ারলুং সাংপো নদীটি তিব্বত থেকে ভারতে প্রবেশের পর ‘সিয়াং’ নামে পরিচিত হয় এবং পরবর্তীতে এটিই আসামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিখ্যাত ব্রহ্মপুত্র নদে রূপ নেয়. এই নদীটি অরুণাচল প্রদেশ ও আসামের লাখো মানুষের জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত.
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উজানে চীন এত বড় বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহে মারাত্মক পরিবর্তন আসতে পারে. এর ফলে নিম্নাঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ ও ভয়াবহ কৃত্রিম বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে.
ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে এই নদী ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল:
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় লিখিত জবাবে জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের সব ধরনের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং নিম্ন অববাহিকার মানুষের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে. নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত নদী প্রকল্পে স্বচ্ছতা, তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম পরামর্শের বিষয়ে বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসলেও এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি.
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের প্রস্তাবিত এসইউএমপি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং নিম্নাঞ্চলের মৌসুমি বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা এবং চীন যদি কখনো উজান থেকে পানি প্রত্যাহার বা প্রবাহ পরিবর্তন করে, তবে সেই ঝুঁকি মোকাবিলা করা. এই কারণে অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি প্রকল্পটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি. এছাড়া সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা, নদী পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজও দ্রুত জোরদার করা হচ্ছে.
মন্তব্য করুন