২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোল করে ফুটবল বিশ্বে এক নতুন রূপকথার জন্ম দিয়েছেন মেক্সিকোর ফরোয়ার্ড জুলিয়ান কুইনোনোস। এই গোলের পর শুধু মেক্সিকোতেই নয়, তাঁর জন্মভূমি কলম্বিয়াতেও তিনি এখন আলোচনার মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। ইতিহাসের প্রথম কলম্বিয়ান ফুটবলার হিসেবে অন্য কোনো দেশের হয়ে বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য এক কীর্তি গড়েছেন তিনি। কলম্বিয়ার মাগুই পাইয়ানে জন্ম নেওয়া কুইনোনোস শৈশবে অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে কোনো আধুনিক একাডেমি না থাকায় তিনি খালি পায়েই ফুটবল খেলতেন। ফুটবলার হিসেবে তাঁর প্রকৃত উত্থান ও গড়ে ওঠা মূলত মেক্সিকোতে, যে দেশ তাঁকে কেবল একটি ক্লাবের চুক্তিই দেয়নি, বরং দিয়েছে ভবিষ্যৎ, পরিবার, নতুন পরিচয় এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের মর্যাদাপূর্ণ জার্সি। দেশের দেওয়া সেই বিশ্বাসের প্রতিদান কুইনোনোস বিশ্বমঞ্চের প্রথম ম্যাচেই মাত্র নয় মিনিটের মাথায় গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
বিশ্বকাপের জমকালো মঞ্চ কিংবা আজটেকা স্টেডিয়ামের গর্জনের অনেক আগে কুইনোনোস ছিলেন মাগুই পাইয়ানের এক অবাধ্য ফুটবলপাগল শিশু, যিনি প্রায়ই বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা খালি পায়ে মাঠে কাটিয়ে দিতেন। কখনও কখনও খেলার নেশায় খাওয়ার জন্যও বাড়ি ফিরতেন না, আর খেলার মাঠে শর্টস ছিঁড়ে গেলে তাঁর মা সেটি সেলাই করে দিলে তিনি পুনরায় মাঠে নেমে যেতেন। তাঁর শৈশবের কোচ চেসার ভ্যালেন্সিয়ার মতে, সেই কঠিন শৈশবে খালি পায়ে খেলার অভ্যাসের কারণেই কুইনোনোজের গোড়ালির শক্তি, বল মারার ধরন, শারীরিক ভারসাম্য ও গতিশক্তি অন্য সবার চেয়ে আলাদা ও শক্তিশালীভাবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে ক্যালির ফুটবল পাজ একাডেমিতে তাঁর নিরলস পরিশ্রমের জন্য সতীর্থরা তাঁকে ‘প্যান্থার’ নামে ডাকত, যদিও গোলমুখে তাঁর আগ্রাসী আক্রমণের ধরনের জন্য কোচ তাঁকে সিংহের সাথে তুলনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
২০১৬ সালে মেক্সিকোর ক্লাব ‘টাইগার্স উয়ানল’-এ যোগ দেওয়ার মাধ্যমে কুইনোনোজের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। শুরুতে মেক্সিকোর পথটা সহজ না হলেও এই দেশ তাঁকে কলম্বিয়ার চেয়ে বেশি সময়, সুযোগ এবং বিশ্বাস উপহার দিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ২-০ গোলের জয়ে অবদান রাখার পর তাঁর চাচা জেভারসন কুইনোনোস অত্যন্ত আবেগপ্লুত হয়ে জানান যে, জুলিয়ান সবসময় অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য কারিগর এবং আজ সে তাঁর প্রথম বিশ্বকাপে খেলার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি পূরণ করেছে। মেক্সিকো দলে ফরোয়ার্ডের কোনো অভাব না থাকলেও এবং অতীতে গুইলের্মো ফ্রাঙ্কো বা রোগেলিও ফুনেস মোরির মতো খেলোয়াড়রা মেক্সিকোর জার্সি পরলেও তারা কেউই বিশ্বকাপে গোল করতে পারেননি। কিন্তু জুলিয়ান কুইনোনোস মাঠে নামার মাত্র নয় মিনিটের মাথায় গোল করে ইতিহাস নিজের নামে লিখে নেন এবং সেই সাথে খালি পায়ে ফুটবল খেলা কলম্বিয়ার এক সাধারণ শিশুর স্বপ্ন ছোঁয়া গল্প পৌঁছে যায় বিশ্বকাপের সোনালী ইতিহাসে।
মন্তব্য করুন