মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দমনপীড়ন ও নির্যাতনের মুখে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং ভাসানচরের ঘিঞ্জি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার অর্ধেকেরও বেশি হলো শিশু। মাথার ওপর কেবল একটি পলিথিনের ত্রিপল আর বাঁশের বেড়ার তৈরি অস্থায়ী ঘরগুলো এই কোমলমতি শিশুদের স্বাভাবিক ও নিরাপদ শৈশব চিরতরে কেড়ে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তার অভাব, চরম খাদ্য ও পুষ্টি সংকট, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে সংক্রামক রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, শিক্ষার অভাব এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক সহিংসতার মধ্যে রোহিঙ্গা শিশুরা আজ এক অন্ধকার অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার সংকট নিয়ে দুই পর্বের এই বিশেষ প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে শরণার্থী শিবিরের কঠিন ও মর্মান্তিক বাস্তব চিত্র।
কক্সবাজারের কুতুপালং-বালুখালী ১২ নম্বর ক্যাম্পের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মায়ের কোলে চড়ে ঘুরতে দেখা ১৫ মাসের ছোট্ট শিশু রিফাত আরা। এই বয়সে তার দুরন্ত পায়ে হেঁটে বেড়ানো কিংবা আধো-আধো বোলে ঘর মাতানোর কথা থাকলেও তীব্র অপুষ্টির কারণে সে ঠিকমতো বসতেও পারছে না। রিফাতের মতো হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশুর দিন শুরু হয় কোনো না কোনো বঞ্চনা আর রোগযন্ত্রণা নিয়ে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ এবং মানবিক অংশীদার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোর অন্তত ৬ লাখ ২৪ হাজার শিশুর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। তবে এই শিশুদের জীবনের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর তিনটি সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র অপুষ্টি, সংক্রামক ব্যাধির মারাত্মক ঝুঁকি এবং শিক্ষার চরম অনিশ্চয়তা।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে তীব্র অপুষ্টির শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পুষ্টিকেন্দ্রে নিয়মিত ওজন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলেও চাহিদার তুলনায় সেবার পরিধি অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় অনেক শিশু সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রনিক রোগে আক্রান্ত পরিবারের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হার এবং শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের সূচকেও মারাত্মক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই স্বাস্থ্যসেবা টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক তহবিলের তীব্র অর্থসংকট।
স্বাস্থ্যখাতে এই ব্যাপক ফান্ড ঘাটতির কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ, মহামারি প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যকার সমন্বয় প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে শিবিরগুলোতে কলেরার বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে মুখে খাওয়ার বিশেষ টিকাদান অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে হাম, ডায়রিয়া এবং ডেঙ্গুর মতো মারণব্যাধি এখনও শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে টিকে আছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়, যা অনেক শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ সামাল দিতে বিশেষায়িত আইসোলেশন ওয়ার্ড ও টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হলেও পর্যাপ্ত বাজেটের অভাবে তা টেকসই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই চরম হতাশার মধ্যেও কিছু বিশেষ উদ্যোগ ও সেবা কেন্দ্র হাজারও মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে শুরু করেছে। সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিশেষায়িত মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল এবং নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা ‘স্ক্যানু’ (SCANU) সুবিধা শিবিরগুলোর অন্তিম মুহূর্তে আশার আলো দেখাচ্ছে। ক্যাম্পের কাছাকাছি আধুনিক প্রসূতি সেবা, নবজাতকের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা এবং প্রসবপূর্ব সেবা নিশ্চিত করার কারণে বহু মা ও নবজাতকের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি সফলভাবে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রোহিঙ্গা শিশুদের এই অবরুদ্ধ ও অনিশ্চিত শৈশব বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
মন্তব্য করুন