আজ ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডিম দিবস, যা এ বছর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন, যা শক্তি দেয় ও সুরক্ষা করে’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিম কেবল একটি সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবারই নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক গবেষণা ডিমের বহুমুখী পুষ্টিগুণ এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতায় এর অসামান্য ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রায় এক লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, প্রতিদিন নিয়ম করে ডিম খাওয়ার সাথে বয়সের কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার যোগসূত্র রয়েছে। ডিমের কুসুমে থাকা 'কোলিন' নামক উপাদান মানবদেহে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি করার নিউরোট্রান্সমিটার গঠনে সহায়তা করে, যা আলঝেইমারজনিত স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া ডিমের কোলেস্টেরল নিয়ে সমাজে যেসব প্রচলিত কুসংস্কার রয়েছে, সে সম্পর্কেও পরিষ্কার বক্তব্য দিচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান। কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খাওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়, কারণ কুসুমেই রয়েছে চোখ ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধির জন্য ডিমের কোলেস্টেরল নয়, বরং প্রক্রিয়াজাত খাবারের সম্পৃক্ত চর্বিই মূল দায়ী। লাল বা সাদা ডিমের পুষ্টিগুণে কোনো তফাত নেই, এটি শুধুই মুরগির জাত ও খাবারের ওপর নির্ভর করে।
একটি ৫০ গ্রাম ওজনের ডিমে প্রায় ৬ গ্রামের বেশি উচ্চমানের প্রোটিন, ৯টি প্রয়োজনীয় অ্যামিনো এসিড এবং ৭০ থেকে ৭৫ কিলোক্যালরি শক্তি মেলে, যা শিশুদের বৃদ্ধি ও প্রবীণদের পেশিক্ষয় রোধে অত্যন্ত কার্যকর। বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে গত দেড় দশকে দেশে ডিমের বার্ষিক উৎপাদন প্রায় চার গুণ বেড়ে ২,৪৪১ কোটিতে পৌঁছেছে, যার ফলে মাথাপিছু প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে বার্ষিক ১৩৭টি। তবে উৎপাদনে স্বাবলম্বী হলেও জাতীয় পর্যায়ে পুষ্টির বৈষম্য এখনো প্রকট। এখনো দেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশ অপুষ্টির শিকার। ছয় মাস বয়সের পর শিশুদের খাদ্যতালিকায় নিয়মিত ডিম যুক্ত করতে পারলে জাতীয় পর্যায়ে অপুষ্টির চিত্র বদলে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে পোলট্রি খাতের এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রান্তিক খামারি ও সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থের সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। পোলট্রি খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে খামারে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতিতে খোসাসহ ডিম বিক্রির সীমা ছাড়িয়ে তরল ডিম ও ডিমের গুঁড়ার (এগ পাউডার) মতো প্রক্রিয়াজাত শিল্পের প্রসার ঘটাতে হবে। এতে করে দেশের অভ্যন্তরীণ বেকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাজার সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে মানসম্মত ডিম বিদেশে রপ্তানির এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে পারে
মন্তব্য করুন