দেশের ব্যাংক খাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব গ্রাহক বর্তমানে ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ শ্রেণিতে ঋণ খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত আছেন, তারা তাদের ঋণের মূল অর্থ এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে সুদ মওকুফের সুবিধা নিতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সব তফসিলি ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
সুবিধা পাওয়ার শর্তসমূহ:
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেসব ঋণ ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ বা কুঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, কেবল তারাই এই সুবিধার আওতায় আসবেন। তবে এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে:
সময়সীমা: ঋণগ্রহীতাকে অবশ্যই ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে তার ঋণের মূল অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
পর্ষদের অনুমোদন: সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সুদ মওকুফের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
আন্তরিকতা যাচাই: ঋণগ্রহীতার অতীতের রেকর্ড, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধে তার আন্তরিকতা যাচাই-বাছাই করা হবে।
এককালীন পরিশোধ: সুবিধাটি পাওয়ার মূল শর্ত হলো, গ্রহীতাকে তার অতীতের সকল বকেয়া ও আর্থিক দায় একত্রে পরিশোধ করতে হবে।
কেন এই উদ্যোগ?
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে যাওয়ায় তারল্য সংকট এবং নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অনাদায়ী অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসবে, যা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এবারের নির্দেশনায় আগের কিছু শর্ত শিথিল করা হয়েছে, যাতে সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকই এই সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ঋণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত ও সতর্কতা:
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “এই সুযোগ যেন রাজনৈতিক প্রভাব বা অপব্যবহারের মাধ্যমে কেউ না পায়, তা বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া এটি যেন কোনো নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়, সেটিও খেয়াল রাখা জরুরি।” অনেক সাধারণ গ্রাহক বা ব্যবসায়ী যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন, তাদের মাঝে যাতে হতাশা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে তা দেশের বর্তমান টালমাটাল ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন দেখার বিষয়, ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনা কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারে।
আপনার কি মনে হয় এই সুদ মওকুফের সুযোগ ব্যাংক খাতে দীর্ঘমেয়াদী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে?
মন্তব্য করুন