ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এখন আর কোনো গোপন সংঘাত নয়, বরং তা এক অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়া এবং তার জবাবে ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রখ্যাত কৌশলগত বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, দুপক্ষের এই ‘চোখের বদলে চোখ’ (An eye for an eye) নীতি বা প্রতিশোধমূলক পাল্টাপাল্টি আঘাতের চক্র যেকোনো মুহূর্তে ভুল হিসাব-নিকাশের (Miscalculation) কারণে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ম্যাগনিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংকটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই অনমনীয় মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক চরম অস্থির ও বারুদ ঠাসা পরিবেশ তৈরি করেছে, যার কোনো টেকসই বা স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমাধান এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে লেবানন, গাজা কিংবা লোহিত সাগরীয় অঞ্চলের চলমান ফ্রন্টগুলোতে এখনো কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমঝোতা না আসায় এই সংকট আরও বহুগুণ ঘনীভূত হচ্ছে।
এলিজাহ ম্যাগনিয়ারের সাক্ষাৎকার থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রণক্ষেত্রের ৪টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নিয়ন্ত্রণের কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস: ম্যাগনিয়ারের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো সংঘাতের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পক্ষ (যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান) অবাস্তবভাবে বিশ্বাস করছে যে তারা উত্তেজনার মাত্রা ও এর বিস্তার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
২. সংযমের দেওয়াল ভেঙে পড়া: যখন একই ধরনের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার ঘটনা বারবার ঘটতে থাকে, তখন মাঠপর্যায়ের সামরিক কমান্ডারদের সংযম ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে যেকোনো একপক্ষের একটি অতি-আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ পুরো সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
৩. আলোচনার অনুপস্থিতি: বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কোনো কূটনৈতিক আলোচনা বা ব্যাক-চ্যানেল ডায়ালগ সচল নেই। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পুরোপুরি ভেঙে পড়লে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রিত মনে হওয়া এই ছোটখাটো সংঘাতও বড় আকারের আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ নেবে।
৪. ‘লাল রেখা’ বা রেড লাইন অতিক্রমের ঝুঁকি: ইতিহাসের উদাহরণ টেনে এই বিশ্লেষক বলেন, অতীতে বহু বড় যুদ্ধ শুরু হয়েছে ছোট কোনো ভুলের মাধ্যমে। একটি একক হামলা যদি কোনো পক্ষের অলিখিত ‘লাল রেখা’ বা রেড লাইন অতিক্রম করে ফেলে, তবে তা দ্রুত চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে যা কোনো পরাশক্তির পক্ষেও থামানো সম্ভব হয় না।
চলমান এই দ্বন্দ্বে ইতোমধ্যে জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। একদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ওয়াশিংটনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তাদের সশস্ত্র বাহিনী কোনো হুমকি জবাবহীন রাখবে না; অন্যদিকে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন পারস্য উপসাগরে তাদের সামরিক উপস্থিতি এবং রণতরী পাহারা আরও জোরদার করছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ ম্যাগনিয়ারের এই সতর্কবার্তার সাথে একমত পোষণ করেছেন। তারা মনে করেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ধমনী খ্যাত হরমুজ প্রণালির এই সংকট যদি দ্রুত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রশমিত করা না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মুখে পড়বে। যেখানে ‘চোখের বদলে চোখ’ নেওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলকেই অন্ধ করে ছাড়বে।
মন্তব্য করুন