সম্প্রতি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তালেবানের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দীর্ঘ কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় থাকলেও, এবারের এই বৈঠক তাদের ইউরোপীয় কূটনীতিতে প্রবেশাধিকারের একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ইইউভুক্ত কোনো দেশই তালেবান সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, তবুও নিরাপত্তার স্বার্থে এই আলোচনাকে এক নতুন বাঁক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইউরোপে বসবাসরত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসন। ইউরোপের দেশগুলো থেকে অবৈধভাবে বসবাসকারী কিংবা গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আফগানদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজতর করতেই ইইউ দেশগুলোর সিংহভাগ এই আলোচনায় সম্মত হয়েছিল। বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভো পরিষ্কার করেছেন যে, তালেবান প্রতিনিধিদের ভিসা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাদের শাসনব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এটি মূলত একটি যৌথ ও দৃঢ় পদক্ষেপ, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিবাসন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
এই বৈঠকের পেছনে ইইউর বাস্তবমুখী বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা এই ঘটনাকে তালেবান শাসনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই এই বৈঠকের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, যে শাসনব্যবস্থা আফগান নারী ও মেয়েদের মৌলিক অধিকার হরণ করছে, তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সম্পৃক্ততা মানবাধিকারের চরম অবমাননা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, জোরপূর্বক আফগান নাগরিকদের তালেবানের হাতে তুলে দেওয়া মানেই তাদের নিশ্চিত বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে লাখ লাখ আফগান নাগরিক বসবাস করছেন। এর মধ্যে অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িতদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় তালেবানের সহযোগিতা ছাড়া ইইউর পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে একদিকে তালেবান চাইছে ইউরোপীয় মিশনগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি ও কনস্যুলার সুবিধা নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে, অন্যদিকে ইইউর সরকারগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অভিবাসন সংকট নিরসনে তালেবানের সঙ্গে নিরুপায় হয়েই আলোচনার টেবিলে বসছে। এই টানাপোড়েনে বিশ্ব কূটনীতিতে আফগানিস্তান ইস্যুতে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে মানবাধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা উভয়কেই ভারসাম্যপূর্ণভাবে দেখার চ্যালেঞ্জ এখন ইইউর সামনে।
মন্তব্য করুন