দেশের তামাক বাজারের অন্যতম প্রধান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের (বিএটিবি) বিরুদ্ধে সাড়ে ২৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-মূসক)। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদিত সীমার চেয়ে ২৬ গুণেরও বেশি ব্যান্ডরোল বা সিকিউরিটি স্ট্যাম্প ‘অপচয়’ দেখিয়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার তথ্য মিলেছে।
এনবিআরের অভ্যন্তরীণ অডিট ও ভ্যাটের তদন্ত দল ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসের দাখিলপত্র ও ব্যান্ডরোল ব্যবহারের হিসাব পর্যালোচনা করে এই ফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটন করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, সিগারেটের প্রতি প্যাকেটে ব্যবহৃত ব্যান্ডরোলের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। ভ্যাট বিধিমালা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১ শতাংশ স্ট্যাম্প অপচয় হিসেবে ছাড় পাওয়ার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে বিএটিবি তাদের দাখিলপত্রে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে ৪.৪৯ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৬.৩১ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় দেখিয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ওই তিন মাসে মোট ৫৬ লাখ ৭ হাজার ৮৮৩টি স্ট্যাম্প অপচয় হিসেবে দেখিয়েছে। এর মধ্যে নির্ধারিত ১ শতাংশ সীমার অতিরিক্ত হিসেবে মোট ১০ লাখ ৪ হাজার ৪৫৭টি সিকিউরিটি স্ট্যাম্প অপচয় বা বিনষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এনবিআরের তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বিএটিবির সাভার কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, অপচয় হওয়া স্ট্যাম্প রোলের খোলা কার্টনে কিছু স্ট্যাম্প একদম নতুন এবং কিছু প্যাকেট সদ্য খোলা রয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে স্ট্যাম্প নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এর সপক্ষে কোনো দাপ্তরিক বিনাশকরণ সনদ বা বৈধ প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
ভ্যাট বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, অপচয় দেখানো ওই ১০ লাখের বেশি অতিরিক্ত স্ট্যাম্পের মোট মূল্য ১ কোটি ৪৮ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ টাকা। এর বিপরীতে ৬৫-৬৭ শতাংশ হারে সম্পূরক শুল্ক ১৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৮৩৪ টাকা এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট ৪ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ১৮৭ টাকা প্রযোজ্য। সবমিলিয়ে মোট ২৩ কোটি ২৪ লাখ ৭১ হাজার ২১ টাকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে ভ্যাট বিভাগের এলটিইউ ইউনিট বিএটিবির বিরুদ্ধে মূসক আইন অনুযায়ী কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করেছে এবং ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিএটিবি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানিয়েছে যে, কারখানার শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকা এবং অতি-উচ্চগতির মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও পেপার জ্যামের ফলে বিপুল পরিমাণ স্ট্যাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া নষ্ট হওয়া এসব স্ট্যাম্পের বিপরীতে কোনো সিগারেট উৎপাদিত বা বাজারে সরবরাহ করা হয়নি বিধায় কোনো করযোগ্য ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এনবিআর কর্তৃপক্ষ এবং ভ্যাট বিভাগের তদন্ত দল মনে করছে, আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যা তামাক খাতের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন