মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বাড়তে শুরু করেছে। মূলত লেবাননে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া এবং পারস্য উপসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ধীরগতিতে হওয়ার কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর মূল্য আজ শুক্রবার (১৯ জুন) শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত বুধবারের (১৭ জুন) পর এবারই প্রথম ৮০ ডলারের গণ্ডি পার হলো। তেলের বাজারের এই অস্থিরতা এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
১. লেবাননে নতুন সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তেলের দামের এই আকস্মিক বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি লেবাননে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি চুক্তিকে নতুন করে হুমকির মুখে ফেলেছে। এছাড়া দক্ষিণ ইসরাইলে হিজবুল্লাহ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে চার ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার জের ধরে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করা হয়েছে।
২. হরমুজ প্রণালির ধীরগতি ও তেলের জাহাজের দীর্ঘ লাইন দীর্ঘদিন ট্রান্সপন্ডার (ট্র্যাকিং সিস্টেম) বন্ধ করে পারস্য উপসাগরে অবস্থান করার পর গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সৌদি আরবের তিনটি সুপারট্যাংকার, হংকংয়ের একটি তেল ট্যাংকার এবং ফ্রান্সের একটি এলএনজি ট্যাংকার সীমিত পরিসরে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে কয়েকটি জাহাজের এই যাতায়াত যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনায় একেবারেই নগণ্য। স্বাভাবিক সময়ে এই চ্যানেল দিয়ে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৩০টি জাহাজ চলাচল করলেও বর্তমানে প্রায় ৫০০-এর বেশি জাহাজ পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার জন্য প্রণালিটির মুখে জটলা পাকিয়ে অপেক্ষা করছে।
৩. নৌ-মাইন ও নাবিকদের নিরাপত্তা শঙ্কা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই নৌপথটি পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে জাহাজের ওপর অন্তত ৪৬টি হামলা হয়েছে, যাতে ১৪ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া প্রণালিতে ইরানের পেতে রাখা নৌ-মাইনের উপস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিষ্কার করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ সমাপ্তি এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এর ফলে আজ শুক্রবার তেলের বাজারে তীব্র ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে এবং আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তিতে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে ৮০ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ট্যাংক মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ইন্টারট্যাঙ্কো’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইলকিন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নিরাপদ যাতায়াতের স্পষ্ট রূপরেখা না পাওয়া পর্যন্ত অনেক জাহাজ মালিকই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারে দ্বিধাবোধ করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সার্বিক অবস্থা ইতিবাচক মনে হলেও জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর কাছে নাবিকদের সুরক্ষার বিষয়টিই এখন সবার আগে প্রাধান্য পাচ্ছে।
মন্তব্য করুন