দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান 'পাবনা মানসিক হাসপাতাল'-এর পুরুষ ওয়ার্ডের ভেতরে দুই রোগীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই এক মানসিক রোগীর নির্মম মৃত্যু হয়েছে।
গত ২ জুন গভীর রাতে হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভেতরে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা দীর্ঘ সময় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। পরবর্তীতে সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যায় ঘটনাটি গণমাধ্যম ও লোকমুখে জানাজানি হলে পুরো জেলাজুড়ে এবং স্বাস্থ্য বিভাগে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সেবার মান ও দায়িত্বহীন ব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী রোগীর স্বজনসহ সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল প্রশাসন ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন তীব্র মানসিক ব্যাধি 'সিজোফ্রেনিয়ায়' (Schizophrenia) আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খোঁজাখালি গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল ইসলাম (২৮) এবং ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হককে (২৬) হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ওই দিন রাত আনুমানিক ৩টার দিকে দুই রোগীর মধ্যে হঠাৎ করেই কোনো একটি বিষয় নিয়ে চরম সহিংস মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে নাজমুলের উপর্যুপরি আঘাতে মাথায় গুরুতর চোট পেয়ে ওয়ার্ডের মেঝেতেই প্রাণ হারান ইনজামুল হক। এই ঘটনায় অপর রোগী নাজমুল নিজেও গুরুতর আহত হন।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক বাদী হয়ে গত ৩ জুন পাবনা সদর থানায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইজাজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে ছেলেটা আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, সেও তো একজন গুরুতর মানসিক রোগী। এমন দুজন মারমুখী রোগীকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিভাবে একই সাথে অরক্ষিত অবস্থায় রাখল? যখন তারা গভীর রাতে মারামারি করছিল, তখন সেখানে ডিউটিরত নার্স বা সেবাকর্মীরা কেন কেউ তা থামাতে এগিয়ে এল না?"
এদিকে, অভিযুক্ত নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক পাল্টা অভিযোগ এনে বলেন, "ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর সকালবেলা হাসপাতালের ভেতরের লোকজন ও কর্মচারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার অসুস্থ ছেলেকে অমানুষিক মারধর করে তার হাত-পা ভেঙে দিয়েছে।"
হাসপাতালের এই করুণ দশা এবং নিরাপত্তার অভাব নিয়ে মুখ খুলেছেন নার্সিং ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা:
নার্সিং সুপারিন্টেনডেন্ট রেখা আক্তার: তিনি জানান, অনেক সময় সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের বাইরে থেকে দেখে একদম শান্ত ও স্বাভাবিক মনে হলেও তারা হঠাৎ করে চরম হিংস্র ও সহিংস আচরণ শুরু করে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে রাতের শিফটে ডিউটিতে থাকা অল্পসংখ্যক নারী নার্সের পক্ষে উন্মত্ত পুরুষ রোগীকে শারীরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব। হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ সেবাকর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে এবং মানসিক রোগী সামলানোর জন্য নার্সদের আলাদা কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা দেওয়া হয় না।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ: ঘটনার সত্যতা সম্পূর্ণ স্বীকার করে পরিচালক বলেন, "যে রোগীরা মারামারি করেছেন তারা দুজনেই অত্যন্ত ওল্ড কেস এবং আগেও এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। গভীর রাতে ঘটনাটি হঠাৎ করে ঘটায় দায়িত্বরত কেউ তাৎক্ষণিকভাবে টের পায়নি।"
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম মামলার অগ্রগতির বিষয়ে বলেন, "যেহেতু এই হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেও একজন অপ্রকৃতিস্থ বা মানসিক রোগী, তাই দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা দায়েরের পর আমরা বিজ্ঞ আদালত এবং মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষ আইনি চিঠি দিয়েছি। সেখান থেকে চিকিৎসকদের বোর্ড গঠনপূর্বক নির্দেশনা বা পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে অফিসিয়াল মতামত জানার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
মন্তব্য করুন