প্যারিসের ঐতিহাসিক লাতিন কোয়ার্টারের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গ্র্যান্ড মসজিদটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং এটি ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের অমূল্য অবদানের এক জীবন্ত দলিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা শেষে ১৯২৬ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই মসজিদটি ২০২৬ সালে তার শতবর্ষ পূর্ণ করল। উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম আফ্রিকার যে অকুতোভয় মুসলিম সৈনিকরা ফ্রান্সের পক্ষে যুদ্ধ করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবেই মূলত এই নান্দনিক স্থাপনাটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফরাসি সরকার। ১৯২০ সালে ফরাসি পার্লামেন্টে অনুমোদনের পর কয়েক বছরের নিরলস পরিশ্রমে নির্মিত এই মসজিদটি আজ প্যারিসের সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যশৈলীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
স্থাপত্যকলার দিক থেকেও গ্র্যান্ড মসজিদ পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। এর নকশায় ফুটে উঠেছে আন্দালুসীয় ও মুরিশ শৈলীর চমৎকার সংমিশ্রণ। ৩৩ মিটার উঁচু মিনার, সূক্ষ্ম কারুকার্যময় খিলান, দৃষ্টিনন্দন মোজাইক এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির অনবদ্য সমন্বয় মসজিদটিকে প্যারিসের অন্যতম দর্শনীয় নিদর্শনে পরিণত করেছে। তবে এর গুরুত্ব কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এটি ফ্রান্সে ইসলামি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে। বর্তমানে রেক্টর শেমস এদ্দিন হাফিজের নেতৃত্বে এই প্রতিষ্ঠানটি ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শতবর্ষের এই দীর্ঘ যাত্রায় মসজিদটি মানবিকতার এক বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি দখলদারিত্বের কালো দিনগুলোতে তৎকালীন রেক্টর সি কাদ্দুর বেংগাব্রিতের নেতৃত্বে এই মসজিদটি অনেক নির্যাতিত মানুষের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা আজ ইতিহাসবিদদের গবেষণার অন্যতম বিষয়। ঐতিহাসিক বেনজামিন স্তোরার মতে, ফ্রান্সের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহাবস্থানের এক শক্তিশালী সেতু হলো এই মসজিদ। এটি মুসলিম অবদান এবং তাদের ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
২০২৬ সালে এই শতবর্ষ উদযাপনে ফ্রান্সের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা অংশ নিয়েছেন। বছরজুড়ে আয়োজিত প্রদর্শনী, ঐতিহাসিক দলিল উপস্থাপন এবং ইসলামি শিল্পকলা বিষয়ক সেমিনারগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে এই মসজিদের গৌরবময় অতীত। সময়ের পরিক্রমায় গ্র্যান্ড মসজিদ আজ ফ্রান্সের ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়, যা আত্মত্যাগ, বৈচিত্র্য এবং সম্প্রীতির অটুট বন্ধনকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।
মন্তব্য করুন