মার্কিন ডলারের দুর্বল অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সাম্প্রতিক ভঙ্গুর দশার কারণে ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। যার সরাসরি ও জোরালো প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণের বাজারে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি মূল্যবান ধাতুটির বাজারকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম শূন্য দশমিক চার শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৯১ দশমিক শূন্য সাত ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে গত সপ্তাহেই স্বর্ণের দাম দুই মাসেরও অধিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল।
ডিসেম্বর ডেলিভারির জন্য মার্কিন গোল্ড ফিউচারের দামও শূন্য দশমিক তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ভরির দাম দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪৪৮ দশমিক ১০ ডলারে। ঠিক একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার সূচক শূন্য দশমিক এক শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডলারের মান কমে যাওয়ার ফলে অন্য মুদ্রার ধারকদের কাছে ডলারে মূল্য নির্ধারিত স্বর্ণ কেনা তুলনামূলক অনেক সহজ ও সস্তা হয়ে গেছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় মূল্যস্ফীতির তথ্য ডলারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে, যা স্বর্ণের দামকে ৪ হাজার ৪০০ ডলারের লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জুলাই মাসের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই অপ্রত্যাশিতভাবে নিম্নমুখী ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল মূল্যস্ফীতির তথ্য, যার ফলে আগামী মাসে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেড কর্তৃক সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কমে গেছে। সিএমই ফেডওয়াচের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে ফেডের সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা বর্তমানে মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক মাস আগেও ছিল ৪৭ শতাংশ। অর্থনীতিতে সুদের হার কম থাকলে বা সুদের হার হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগ-ব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট কমে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের এখন প্রধান নজর রয়েছে মার্কিন ফেডের জুলাই মাসের বৈঠকের প্রকাশিতব্য কার্যবিবরণীর দিকে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে কেবল মার্কিন অর্থনীতির ডেটা বা ডলারের দুর্বলতাই নয়, বরং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কাও বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংবেদনশীল অঞ্চলের যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে সব ধরনের বিনিয়োগ পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালির সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বিশ্বজুড়েই আরও বেশি মাত্রায় বেড়ে যায়। স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও এর জোরালো ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম এক দশমিক চার শতাংশ বেড়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ ডলার, প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক তিন শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭৫২ দশমিক ৩৬ ডলার এবং প্যালাডিয়ামের দাম এক দশমিক ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৩৫ ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন