চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবস্থিত একসময়ের সুপরিচিত সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ৫৪ দশমিক ৯৯ একর জমি ও স্থাপনা এখন ব্যবহার হতে যাচ্ছে অত্যাধুনিক অস্ত্র উৎপাদনে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত এই মিলটির সব সম্পদ বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার (বিওএফ) সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতীকী মূল্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট) মিল প্রাঙ্গণে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান রাজীব জানিয়েছেন যে, বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠিতব্য এই চুক্তি স্বাক্ষর ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলমসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, দেশের প্রতিরক্ষা খাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং সমরাস্ত্রের ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যেই ফৌজদারহাটের এই জমিটি ব্যবহার করা হবে। এখানে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের পরিধি বাড়াতে একটি উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপনের পাশাপাশি সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত সংরক্ষণাগার নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
যেভাবে চূড়ান্ত হলো হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিওএফ সম্প্রসারণের জন্য জলিল টেক্সটাইল মিলের জমি ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু হয় মূলত ২০২৪ সালে। ওই বছরের জুনে তৎকালীন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল মিলটি পরিদর্শন করে জায়গাটিকে কৌশলগতভাবে উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেন। এরপর অক্টোবর মাসে সেনাসদরের কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) শাখা থেকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে জমিটি প্রতীকী মূল্যে হস্তান্তরের প্রস্তাবটি আটকে গেলেও, পটপরিবর্তনের পর চলতি বছরের (২০২৬) ১ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ওই জমি প্রতীকী মূল্যে বিওএফের কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
সাবেক শ্রমিকদের ক্ষোভ ও বকেয়া পাওনা কারখানাটি সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হলেও জলিল টেক্সটাইলের সাবেক শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ হওয়া লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি অব্যবস্থাপনায় ২০০৪ সালে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্মের অডিট অনুযায়ী ১ হাজার ৭৩ জন শ্রমিকের বেতন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ড বাবদ মোট ২০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। আর্থিক সংকট ও চিকিৎসার অভাবে ইতোমধ্যে ৩৭৫ জনেরও বেশি শ্রমিক মারা গেছেন। জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড সিবিএ সভাপতি মসিউদ্দৌলা জানান যে, দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করেই কারখানাটি হস্তান্তর করা হচ্ছে, যা অমানবিক। বৃহস্পতিবার হস্তান্তর অনুষ্ঠানের দিনও তারা পাওনা আদায়ের দাবিতে অনুষ্ঠানস্থলের অদূরে কর্মসূচি পালন করবেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
মন্তব্য করুন