রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় এবং ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) সুপ্রিম কোর্টের উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। রায়ের ৬৯ পৃষ্ঠা এবং ডেথ রেফারেন্সের ৩ পৃষ্ঠাসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার মূল নথি ও মামলার ডকেট আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট ডেথ রেফারেন্স শাখায় পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ট্রাইব্যুনালের অফিস সহায়ক শহিদুল ইসলাম মামলার এই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে উচ্চ আদালতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এর আগে গত ৭ জুন (রোববার) এই আলোচিত হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।
মামলার নথি ও রায় উচ্চ আদালতে পৌঁছানোর পর এই বিশেষ মামলা নিয়ে সচিবালয়ে কথা বলেছেন দেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি এই মামলাটিকে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হিসেবে দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “আমার প্রবল প্রত্যাশা, আগামী তিন মাসের মধ্যেই এই মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের আইনি প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি করা সম্ভব—যদি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চ এটিকে 'প্রায়োরিটি' (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) দিয়ে ডে-টু-ডে শুনানি করেন। আশা করি, বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্ট জনস্বার্থে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এটি দ্রুত করবেন।”
একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে মাত্র ২০ দিনের মাথায় উচ্চ আদালতে নথি পৌঁছানোর নজিরবিহীন টাইমলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
১৯ মে ২০২৬ (হত্যাকাণ্ড): পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকাল সাড়ে ৯টায় ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে আসামির দরজার সামনে রামিসার জুতা দেখে বাবা-মা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পান।
২০ মে ২০২৬ (মামলা ও গ্রেফতার): জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্নাকে আটক করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্বামী সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
২৪ মে ২০২৬ (চার্জশিট দাখিল): মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান মাত্র ৫ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন এবং ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন।
১ জুন ২০২৬ (অভিযোগ গঠন ও বিচার শুরু): ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন। মামলায় মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়।
৭ জুন ২০২৬ (চূড়ান্ত রায়): মাত্র এক সপ্তাহের ট্রায়াল বা বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ঘাতক দম্পতি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে যুগান্তকারী রায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
৯ জুন ২০২৬ (উচ্চ আদালতে নথি): রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি ও ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এত কম সময়ের মধ্যে একটি জটিল হত্যা মামলার তদন্ত, চার্জশিট, সাক্ষ্যগ্রহণ, চূড়ান্ত রায় এবং ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে পাঠানোর ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আইনমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, উচ্চ আদালতের শুনানির পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসার খুনিদের ফাঁসির রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে, যা সমাজে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা দেবে।
মন্তব্য করুন