দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
Dhaka Files
প্রকাশ : Oct 19, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ: শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ: শিক্ষাব্যবস্থা, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

ইউরোপের একাধিক দেশে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে তীব্র বিক্ষোভ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়ার মতো দেশগুলোতে হাজার হাজার তরুণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। দেশভেদে স্থানীয় সমস্যা ভিন্ন হলেও মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, শিক্ষক সংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, ব্যাপক দুর্নীতি এবং কর্মসংস্থানের চরম অভাব। বিশেষ করে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরবর্তীতে একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে এবং কয়েকটি দেশে তা সহিংস সংঘর্ষেও গড়িয়েছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ পর থেকেই শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ ক্লাসের সময়সূচি, শিক্ষক পদের তীব্র ঘাটতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জটিল ও অস্পষ্ট পদ্ধতির কারণে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক সংকট দূর না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে বছরের পর বছর নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের এই প্রাথমিক দাবির সঙ্গে পরবর্তীতে সাধারণ মানুষও যুক্ত হন। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানির চড়া দামের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে জনতা। মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ও এর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন ‘জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার’ (সিজিটি) এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন ও ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর জোরালো দাবি তুলেছে। উল্লেখ্য, বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দুই মেয়াদের শাসনের শেষ সময় চলছে এবং আগামী ২০২৭ সালের এপ্রিলে দেশটিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

স্পেনে গত সেপ্টেম্বর থেকেই রেকর্ড পরিমাণ বাড়ির দাম ও আকাশছোঁয়া ভাড়ার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন অধিকারকর্মীরা। ৮৭ বছর বয়সি এক প্রবীণ নারী মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর দীর্ঘদিনের বাড়ি থেকে জবরদস্তি উচ্ছেদের মর্মান্তিক ঘটনা এই গণবিক্ষোভের মূল স্ফুলিংগ হিসেবে কাজ করে। একটি বড় বিনিয়োগ তহবিল তাঁর বাড়িভাড়া একলাফে ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই চরম মানসিক চাপ ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ পর ওই নারী মারা যান।

বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে বাড়িভাড়া সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, নির্বিচারে উচ্ছেদ চিরতরে বন্ধ করা এবং যেকোনো আবাসিক সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটেদের সুরক্ষায় একটি জরুরি আবাসন আইন পাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে পার্লামেন্টে ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর প্রবল বিরোধিতায় সেই আইন পাশ করা সম্ভব হয়নি। এর জследী ফলস্বরূপ, আগামী ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ। সংস্কারমূলক নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে তাঁর আরও বড় ও বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন।

স্পেনের প্রতিবেশী দেশ পর্তুগালেও তীব্র আবাসন সংকটের প্রতিবাদে রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রীয় চত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন শত শত মানুষ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বিস্ময়করভাবে ১২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ। বাড়ির দাম ও মাসিক ভাড়া সাধারণ মানুষের আয়ের সম্পূর্ণ নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় আবাসন সংকট এখন পর্তুগালের জাতীয় জীবনের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ইতালির মিলানেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ সামগ্রিক সংসার খরচ বৃদ্ধির প্রতিবাদে জোরালো বিক্ষোভ হয়েছে। যদিও শনিবারের এই মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তা সহিংসতায় রূপ নেয়। মুখোশধারী কিছু বিক্ষুব্ধ মানুষ দাঙ্গা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও পেভমেন্টের ব্লক ছুঁড়তে শুরু করে। এ সময় রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করতে বার ও রেস্তোরাঁর টেবিল-চেয়ার দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধকতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইতালির পাশাপাশি ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বেলজিয়ামেও ছোটোখাটো বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, বলকান রাষ্ট্র আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে গড়ায়। দেশটিতে ব্যাপক দুর্নীতি, তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নমানের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমেছেন। বিশেষ করে চলতি বছরের গ্রীষ্মে আলবেনিয়ার সমুদ্র উপকূলে একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কিত ওই প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট।

তরুণ ও সাধারণ মানুষের এই লাগাতার বিক্ষোভের মুখে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো। ফ্রান্সে শিক্ষক সংকট কিছুটা মোকাবিলা করতে সরকার অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিবন্ধন ফি বাড়ানোর যে বিতর্কিত পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তাও পুরোপুরি বাতিল করেছে ফরাসি সরকার। এছাড়া জ্বালানির দাম নিয়ে প্রাথমিক বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প খাতে পেট্রলের ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল ফরাসি প্রশাসন।

তবে এসব খয়রাতি বা আংশিক পদক্ষেপে আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ চলমান সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থী আন্দোলনকারী ও সুযোগসন্ধানী লুটপাটকারীদের দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে যে, সরকার এর চেয়ে বেশি আর কোনো বড় ছাড় দিতে রাজি নয়। ফ্রান্সে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকার ও সাধারণ মানুষের দাবির মধ্যে কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতা হয় তার ওপর। অন্যদিকে, স্পেনে আবাসন সংক্রান্ত জরুরি প্রস্তাবগুলো পার্লামেন্টের মাধ্যমে পাশ করা গেলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে, তবে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: জাপান, অস্ট্রে

1

মেয়েদের ফুটবল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে রাফায

2

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: মৃতের সংখ্যা ১৪৩০, নিখোঁজ প্রা

3

দুর্গাপূজায় রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে শপিংমল-মার্কেট

4

হাতিয়ার বিস্ময়: মাত্র ৮ মাস ১০ দিনে কুরআনের হাফেজ শিশু আব্

5

ট্রাম্পের সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বৈঠক ‘অবাস্তব’:

6

ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক যুদ্ধ: ইরান কি নতি স্বীকার করবে?

7

জুলাইয়ের বীরদের ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে: সাদিক কায়েম

8

খাগড়াছড়িতে যুবলীগের দুই নেতা গ্রেফতার

9

ম্যাকগিনের গোলে স্কটল্যান্ডের জয়

10

অ্যানথ্রোপিকের এআই অ্যাপ 'ক্লড' অচল: বিশ্বজুড়ে সেবা ব্যাহত

11

৯ মাস পর ফেসবুক লাইভে এসে ভক্তদের যা বললেন অসুস্থ অভিনেত্রী

12

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ৩ কারণ

13

বাড়ছে না জ্বালানি তেলের দাম: গুজব না ছড়াতে তথ্যমন্ত্রীর কড়া

14

২৮ বার পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন পেজেশকিয়ান

15

শেখ হাসিনা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম ও ঘৃণ্য ফ্যাসিস্ট ছিলেন: রুহুল

16

অ্যাপল এয়ারপড খুঁজে পাওয়ার উপায় ও ফাইন্ড মাই অ্যাপের কাজ ২০২

17

আট মাসে প্রশাসনে বড় রদবদল: ২ হাজারের বেশি বদলি ও পদায়ন

18

লালন আখড়ায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর

19

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ছবি ও ভিডিও ধারণকালে আটক ১

20