জীবনযাত্রার চরম ব্যয়বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্সে চলমান গণআন্দোলন নজিরবিহীন সহিংস রূপ ধারণ করেছে। দেশজুড়ে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের ব্যাপক সহিংসতা, তোলপাড় সৃষ্টি করা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক বড় শহরের রাজপথ কার্যত যুদ্ধক্ষেত্র ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফ্রান্সের উদ্ভূত এই চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে খোলামেলা উপহাস ও ব্যঙ্গ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘বিপ্লবের’ জন্য ফ্রান্সই এখন বিশ্বের সবচেয়ে স্বাভাবিক গন্তব্য।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তাল ছাত্র ও জনআন্দোলনের পর রোববার সকালে ফরাসি নাগরিকরা রাজপথে ধ্বংসলীলার ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান। দেশটির এই করুণ সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, ‘‘চলুন ফ্রান্সে যাই? চমৎকার জায়গা! কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো বিপ্লব নেই! জানেন তো, ফ্রান্স যেন বিপ্লবের জন্য একদম উপযুক্ত জায়গা। অবিশ্বাস্য! চলুন না সবাই ফ্রান্সে গিয়ে ওদের এই বিপ্লবে যোগ দিই।’’ আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের ভোট আয়োজনের কথা রয়েছে, যার ঠিক পূর্বমুহূর্তে এই অস্থিতিশীলতা দেশটিকে বড় অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ফ্রান্সের এই নজিরবিহীন সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই নৈরাজ্যের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর অভিবাসন নীতিকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘‘বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির দোহাই দিয়ে পশ্চিমা উদারপন্থীরা তৃতীয় বিশ্বকে ফ্রান্সে ও অন্যান্য দেশে আমদানি করেছে। কিন্তু তারা আত্মীকরণ ও সামাজিক সঙ্গতির মৌলিক প্রশ্নগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।’’ ভ্যান্স হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ফরাসিদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, তবে তারা শোনেনি। তিনি আকুল প্রার্থনা জানান, ঐতিহ্যবাহী ফ্রান্সের আরও কোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্য আগুনে ছাই হওয়ার আগেই যেন এই উন্মাদনা বন্ধ হয়।
ধ্বংসস্তূপ প্যারিস ও টাউন হলে আগুন
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে আয়োজিত বিশাল এই বিক্ষোভে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনকারী শীর্ষ সিজিটি (CGT) ইউনিয়ন দাবি করেছে, রাজপথে নামা মানুষের সংখ্যা ছিল ৮ লাখেরও বেশি। বিক্ষোভ সামাল দিতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও আতশবাজি নিক্ষেপ করতে থাকে।
প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোইরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, রাজধানীর মূল রাজপথগুলো সম্পূর্ণ ‘ধ্বংসস্তূপে পরিণত’ হয়েছে। মুখোশধারী উত্তেজিত তরুণের দল রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শত শত দোকানপাট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালায়।
সহিংসতার মাত্রা এতটাই তীব্র ছিল যে, লিমোগেস (Limoges) শহরে অবস্থিত ১৪০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি ঐতিহাসিক টাউন হলে জোরপূর্বক প্রবেশ করে আগুন ধরিয়ে দেয় মুখোশধারী দাঙ্গাকারীরা, যার ফলে পুরো ভবনটি পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এ ছাড়া মার্সেই এবং লিল শহরের দুটি টাউন হল, বোর্দো শহরের একটি পুলিশ ফাঁড়ি এবং লিয়োঁ শহরের পর্যটন অফিসেও ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যারা এই ধ্বংসযজ্ঞ, লুটপাট ও প্রশাসনিক ভবনে হামলায় জড়িত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
মন্তব্য করুন